আজকাল ওয়েবডেস্ক: গঙ্গাসাগরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের আশ্বাস। বাল্যবিবাহ রুখতে ছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা। এক বছরে এক লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক ঘোষণা ঘিরে শনিবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চর্চার কেন্দ্রে কাকদ্বীপ।
আগামী বছরের গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে কাকদ্বীপে প্রশাসনিক বৈঠক করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে সরকারি পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নারীশিক্ষা, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন তিনি। প্রশাসনের তরফে এদিন এলাকার ১ লক্ষ ২৪ হাজার নাগরিকের হাতে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা তুলে দেওয়া হয়।
২০২৯ সালে মুড়িগঙ্গা সেতুর উদ্বোধনের প্রতিশ্রুতি
গঙ্গাসাগরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি মুড়িগঙ্গার উপর স্থায়ী সেতু নির্মাণ। বর্তমানে নদী পারাপারের জন্য জলপথের উপর নির্ভর করতে হয় বাসিন্দা, পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের। ফলে সেতু নির্মাণ হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই প্রকল্প নিয়েই এদিন সময়সীমা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার অভিযোগ তুলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “সাজিয়ে দেব এলাকাকে। আগের সরকার মুড়িগঙ্গার ব্রিজ নিয়ে মিথ্যে কথা বলে গিয়েছিল। ওরা জমি অধিগ্রহণও করেনি, ডিপিআরও করেনি। কথা দিয়ে যাচ্ছি, ২০২৯ সালে এখানে ব্রিজ উদ্বোধন করব।”
মুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে গঙ্গাসাগরে যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ কীভাবে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে সুন্দরবনবাসীর।
বাল্যবিবাহ রুখতে ছাত্রীদের ৫০ হাজার টাকা
উন্নয়নের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উপর বিশেষ জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ে না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের কাছে আবেদন জানান তিনি। মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার বার্তাও দেন। এই প্রসঙ্গে ছাত্রীদের জন্য ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দুই বছর ১৭ হাজার টাকা করে এবং তৃতীয় বছরে ১৬ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
বাল্যবিবাহের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “১৮ বছরের নীচে কোনও বোনকে বিয়ে দেবেন না। পড়ান ওদের।” অল্পবয়সি মেয়েদের গর্ভধারণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে পরিবার ও সমাজের সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। নারীশিক্ষার প্রসার এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করাকেই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
এক বছরে এক লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি
কর্মসংস্থান নিয়েও বড় দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ইতিমধ্যেই ১১ হাজার পুলিশকর্মীকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এক লক্ষ চাকরির ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, “মেধা অনুযায়ী চাকরি হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি হবে।” এই ঘোষণায় চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রত্যাশা বাড়লেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা ভবিষ্যতেই স্পষ্ট হবে।
দেশবিরোধী শক্তি ও নেশার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা
এদিনের বক্তব্যে দেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। মাওবাদী, জঙ্গি ও জেহাদি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার পাশাপাশি এলাকাকে নেশামুক্ত করার উপরেও জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দেশের ক্ষতি করতে পারে এমন শক্তিকে প্রতিহত করার দায়িত্ব প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও রয়েছে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যা দূর করতে জনসচেতনতা বাড়ানোর বার্তা দেন তিনি।
মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তোলার অভিযোগ ঘিরে কটাক্ষ
গত বছর কাকদ্বীপের একটি পুজো কমিটিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনাও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। সেই সময় মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তোলার অভিযোগ উঠেছিল পুলিশের বিরুদ্ধে। এই প্রসঙ্গে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নাম না করে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় যুক্ত আইপিএস আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে তিনি বলেন, “এটাই সনাতনী তাকত!”
সিএএ-র শংসাপত্র নিয়ে প্রশাসনকে নির্দেশ
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে জেলার জেলাশাসক ও মহকুমাশাসককে উদ্দেশ্য করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র শংসাপত্র দ্রুত দেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী ডিসেম্বরে ফের আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তখন এই কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখবেন। ফলে প্রশাসনিক স্তরে শংসাপত্র প্রদানের প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, তা নিয়েও নজর থাকবে।
কাকদ্বীপকে জেলা, সুন্দরবনকে মডেল করার ঘোষণা
রাজনৈতিক বক্তব্যে বিরোধীদের নিশানা করার পাশাপাশি কাকদ্বীপকে জেলা হিসেবে গড়ে তোলা, সুন্দরবনকে মডেল এলাকা হিসেবে উন্নত করা এবং সমস্ত দ্বীপকে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। ফলতায় তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির শেখকে কটাক্ষ করার পাশাপাশি নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে জয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।
সব মিলিয়ে গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি বৈঠক থেকে মুড়িগঙ্গা সেতুর সময়সীমা, নারীশিক্ষায় আর্থিক সহায়তা, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এবং সুন্দরবনের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন—একাধিক বিষয় সামনে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী। এখন নজর ঘোষণাগুলির বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নয়নমূলক কাজ কতটা এগিয়ে যায়, তার দিকে।
