ভোলা সরকারি কলেজে ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধার অভিযোগ তুলে বিএনপি ও ছাত্রদলের সমালোচনা করেছেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ; তিনি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
ভোলায় নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে বাধার অভিযোগ তুলে বিএনপি ও ছাত্রদলের সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি বলেছেন, ‘আজও তারা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবান্ধব হতে পারল না।’ একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে ভোলা শহরের চিলি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও কমিউনিটি সেন্টারে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভোলা সরকারি কলেজ শাখা আয়োজিত নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন এস এম ফরহাদ। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন তিনি।
ভোলা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে নবীনবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে না পারার প্রসঙ্গ তুলে ছাত্রদল ও বিএনপির সমালোচনা করেন ডাকসুর জিএস। তাঁর অভিযোগ, ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।

‘ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র ফিরিয়ে না দিলে হাসিনার পথে হাঁটছেন বলে ধরে নেব’
এস এম ফরহাদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা সংসদে বারবার গণতন্ত্রের কথা বলেন, গণতান্ত্রিক বিজয়ের কথা বলেন। দয়া করে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র হত্যা করবেন না। শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বারবার হরণ করা হচ্ছে। বিএনপি ও ছাত্রদল প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের আচরণ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া না হলে ধরে নেব, আপনারা হাসিনার পথে হাঁটছেন। হাসিনা যেমন প্রথমে ক্যাম্পাসে, পরে সংসদে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন, আপনারাও এখন ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা করছেন।”
নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে না দেওয়া এবং ক্যাম্পাসের বাইরে অনুষ্ঠান করতে বাধ্য করার সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ছাত্রসংগঠনের সমানভাবে কর্মসূচি পালনের সুযোগ থাকা উচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) মেয়াদ শেষ হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তুলে ধরে ফরহাদ বলেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংসদে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত না হলে তা দ্বিচারিতার শামিল হবে।
‘চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি বন্ধ করতে হবে’
ছাত্রদলের সমালোচনা করে এস এম ফরহাদ বলেন, “তাদের চিন্তা হচ্ছে ক্যাম্পাসের দোকানের আশপাশে চাঁদাবাজি করবে, টেন্ডারবাজি করবে, ক্যাম্পাস ভাড়া দিয়ে টাকা তুলবে। এসবের প্রতিবাদ করে ছাত্রশিবির। শিবিরের কারণে তারা চাঁদাবাজি করতে পারছে না। তাই তারা শিবিরকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিতে চায় না।”
তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তিনি ফ্যাসিবাদী হতে চান, নাকি গণতন্ত্র অনুসরণ করতে চান, তা পরিষ্কার করে বলতে হবে। গণতন্ত্র অনুসরণ করলে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে হবে। এটাই পরিষ্কার কথা।”
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয়ের প্রসঙ্গ টেনে ফরহাদ বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের চায় না বলেই তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ছাত্রলীগের মতো পরিণতির মুখোমুখি ছাত্রদল হোক, তা তাঁরা চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
একই দিনে পাল্টা কর্মসূচি, ক্যাম্পাসের বাইরে শিবিরের নবীনবরণ
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভোলা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তারা আগে থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিল। পরে একই দিন ও একই স্থানে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদলও অনুমতি চাইলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের দাবি, সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে কলেজ প্রশাসন আগে অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান না করার অনুরোধ জানায়। ফলে শেষ পর্যন্ত কলেজ প্রাঙ্গণের বদলে শহরের চিলি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
এ ঘটনায় ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তোলেন ছাত্রশিবিরের নেতারা। তাঁদের মতে, নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়ার মতো আয়োজন নিয়ে বিরোধ তৈরি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল। তবে এ বিষয়ে ছাত্রদল ও কলেজ প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের আহ্বান
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নবীন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন, বাস্তবমুখী জ্ঞান বৃদ্ধি এবং নিজেদের যোগ্যতা বিকাশে মনোযোগী হতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেও অনেক শিক্ষার্থী কেন বেকার থাকছেন, বেকারত্ব কমাতে কী উদ্যোগ প্রয়োজন এবং কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে—এসব বিষয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের এমনভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে, যাতে পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।
নবীনদের উচ্ছ্বাস, ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান করার প্রত্যাশা
আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানে ভোলা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণি ও অনার্স প্রথম বর্ষের ছয় শতাধিক নবীন শিক্ষার্থী অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের ফুল ও শুভেচ্ছা উপহার দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী জানান, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদকে কাছ থেকে দেখা, তাঁর বক্তব্য শোনা এবং সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাঁরা উৎসাহিত হয়েছেন। তাঁদের মতে, নবীনবরণ অনুষ্ঠানটি ভোলা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজন করা গেলে আরও ভালো হতো। এতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সহজ হতো এবং নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও সৌহার্দ্য বাড়ত।
ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রসংগঠনগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা গেলে উভয় সংগঠনের ভাবমূর্তি আরও ইতিবাচক হতে পারত। তাঁদের মতে, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব।
উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক কামরুল হাসান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা শাখার নায়েবে আমির অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম।
এ ছাড়া ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর জেলা, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব ছাত্রসংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। নবীনদের বরণ করে নেওয়ার মতো আয়োজন যেন রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই এখন তাঁদের প্রত্যাশা।
