বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখন এক কঠিন বাস্তবতা। এটি শুধু মানবিক সমস্যা নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও কূটনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে এই সংকটের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। অথচ স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থা চলতে পারে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ বাড়াতেই হবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হলে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু আট-নয় বছর পরও সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়।
১২ লাখ মানুষের দায় : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তাদের বড় অংশ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরে বসবাস করছে। অনেকে ভাসানচরেও রয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত। দেশের নিজের জনগোষ্ঠীর জন্যও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ দরকার। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট সামলানো সহজ নয়। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও চাপ পড়ছে। জমি, বন, পানি ও জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। কর্মসংস্থান ও মজুরির ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ত্রাণ বিতরণের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এর সমাধানও হতে হবে পরিকল্পিত ও টেকসই।
প্রত্যাবাসনই স্থায়ী সমাধানের পথ : রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে। সুতরাং স্থায়ী সমাধানের দায়ও প্রধানত মিয়ানমারের। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফেরত পাঠানো প্রত্যাবাসন নয়। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও টেকসই। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার অধিকার এবং জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রত্যাবাসন আবারও নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। রোহিঙ্গাদের আস্থাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো পরিকল্পনা কার্যকর করা উচিত নয়। তারা কেন ফিরতে ভয় পায়, কী ধরনের নিরাপত্তা চায় এবং কী শর্তে ফিরতে প্রস্তুতÑ এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আরও জোরদার হোক : রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য জাতিসংঘ, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করলে চলবে না। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালাতে হবে। একই সঙ্গে রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিতে হবে। মিয়ানমারের ওপর যেসব দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তাদের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। চীন, ভারত ও আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও ফলপ্রসূ করতে হবে। কারণ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সহযোগিতা ছাড়া প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি কঠিন। বাংলাদেশকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে নিয়মিতভাবে সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে। প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার দাবি জানাতে হবে।
অর্থায়ন সংকট উদ্বেগজনক : রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তহবিলের ঘাটতি এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (ঔজচ) তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কটি চূড়ান্ত চাহিদা, নাকি অনুমোদিত বাজেটÑ তা সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি। একইভাবে আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ হ্রাসের দাবিটিও তুলনাযোগ্য তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা দরকার। অর্থায়ন কমলে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ওপর চাপ বাড়ে। শিশুদের পুষ্টি ব্যাহত হয়। নারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কমে যায়। হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ে। তাই আন্তর্জাতিক দাতাদের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তহবিলের ব্যবহার হতে হবে স্বচ্ছ। সহায়তা যেন প্রকৃত প্রয়োজনের মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানো দরকার।
শিবিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে : রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব অপরাধ সাধারণ রোহিঙ্গাদের জীবনকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। এ অবস্থায় শিবিরে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান দরকার। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে সাধারণ শরণার্থীদের হয়রানি করা যাবে না। অপরাধী ও নিরীহ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে। মানবাধিকার ও আইনের শাসন বজায় রেখেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
মানবিকতা ও জাতীয় স্বার্থ একসঙ্গে : বাংলাদেশের সামনে একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে দেশের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে দুটিই অর্জন করা সম্ভব। রোহিঙ্গাদের শিশু-কিশোরদের জন্য উপযোগী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা জরুরি। তাদের নিষ্ক্রিয় ও অনিশ্চিত জীবনে আটকে রাখলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এসব কর্মসূচি এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যকে দুর্বল না করে। স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও পরিবেশ সংরক্ষণেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ কমবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে।
চাই বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা : এখন দরকার কথার চেয়ে কাজ বেশি। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে নিরাপত্তা, অধিকার ও জীবিকার পরিবেশ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাসম্মতি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। প্রত্যাবাসন শুরু হলে তা হতে হবে ধাপে ধাপে। প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করতে হবে। ফিরে যাওয়া মানুষ নিরাপদে আছে কি না, তাদের অধিকার বজায় থাকছে কি না, তা স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো পর্যায়ে গুরুতর ঝুঁকি দেখা দিলে ব্যবস্থা সংশোধন করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ চালু রাখতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উপেক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।
আর অপেক্ষা নয় : রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এক দিনে হবে না। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করাও কোনো সমাধান নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিপুল মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মিয়ানমারকে তার দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে। আর বাংলাদেশকে কূটনৈতিক উদ্যোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসন দরকার। বাংলাদেশের জন্য দরকার টেকসই সমাধান। এই দুই লক্ষ্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সংকটের স্থায়ী সমাধান হলেÑ রোহিঙ্গারা নিজেদের অধিকার নিয়ে দেশে ফিরতে পারবে। বাংলাদেশও দীর্ঘদিনের চাপ থেকে মুক্তির পথে এগোবে। মানবিকতা দেখানো বাংলাদেশের শক্তি। কিন্তু সেই মানবিকতার দায় একা বাংলাদেশের কাঁধে থাকতে পারে না। তাই বিশ্বকে আরও সক্রিয় হতে হবে। মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বাংলাদেশকে দৃঢ়, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশের প্রয়োজন নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তাই এখনই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আর সেই পথের কেন্দ্রে থাকতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
