মাসিক বা ঋতুস্রাব প্রতিটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। সাধারণত একটি মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে এবং এর গড় দৈর্ঘ্য ধরা হয় ২৯ দিন। আর পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব সাধারণত চার থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়।
তবে এই নিয়মে কিছুটা এদিক-সেদিক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু চক্রের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে তাকে অনিয়মিত মাসিক বা অনিয়মিত ঋতুস্রাব বলা হয়।
অনিয়মিত মাসিকের কিছু সাধারণ লক্ষণ
আপনার মাসিক চক্র সবসময় একদম নির্দিষ্ট দিনে না হলেও তা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে তাকে অনিয়মিত হিসেবে ধরা হয়:
- ২১ দিনের কম বা ৩৫ দিনের বেশি ব্যবধানে পিরিয়ড হওয়া।
- পরপর তিন বা তার বেশি মাস পিরিয়ড বন্ধ থাকা।
- স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বা কম রক্তপাত হওয়া।
- পিরিয়ডের স্থায়িত্ব সাত দিনের বেশি হওয়া।
- প্রতি মাসের চক্রের ব্যবধানে ৯ দিনের বেশি পার্থক্য হওয়া (যেমন: এক মাস ২৮ দিনে হলো, পরের মাস ৩৭ দিনে এবং তার পরের মাস আবার ২৯ দিনে)।
- পিরিয়ডের সময় প্রচণ্ড ব্যথা, ক্র্যাম্প, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
- দুই পিরিয়ডের মাঝে, মিলনের পর কিংবা মেনোপজের পর রক্তপাত বা স্পটিং হওয়া।
- এক ঘণ্টায় এক বা একাধিক প্যাড ভিজে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া।
অনিয়মিত মাসিকের কারণসমূহ
অনিয়মিত মাসিকের পেছনে শারীরিক অসুস্থতা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা কারণ থাকতে পারে।
১. শারীরিক ও চিকিৎসাগত কারণ
এন্ডোমেট্রিয়োসিস: জরায়ুর ভেতরের টিস্যু যখন বাইরে বাড়তে শুরু করে।
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম: হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ডিম্বাণু তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং পিরিয়ড অনিয়মিত হয়।
থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা: থাইরয়েডের কম বা বেশি কার্যক্রম হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে।
অন্যান্য: পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID), রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা কিংবা জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের জটিল রোগ।
২. জীবনযাত্রার নানা প্রভাব
অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা।
হঠাৎ করে ওজন অনেক বেড়ে বা কমে যাওয়া।
অতিরিক্ত শরীরচর্চার কারণে শরীরে চর্বির পরিমাণ খুব কমে যাওয়া।
বড় কোনো রোগ বা ভাইরাস সংক্রমণ।
৩. অন্যান্য কারণ
জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল শুরু করা বা বন্ধ করা (পিল বন্ধ করার পরও ছয় মাস পর্যন্ত অনিয়মিত পিরিয়ড হতে পারে)।
স্টেরয়েড বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন।
গর্ভকালীন জটিলতা বা সন্তান জন্মদানের পর স্তন্যদানের সময়।
দেরি হলে যেভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মাসিক চক্র স্বাভাবিক। মাঝেমধ্যে কয়েক দিন এদিক-ওদিক হলে তা সব সময় উদ্বেগের কারণ নয়। তবে আগে নিয়মিত মাসিক হওয়ার পর হঠাৎ অনিয়ম শুরু হলে, বারবার মাসিক বাদ পড়লে কিংবা টানা তিন মাস মাসিক না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে মাসিক না হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বাড়িতে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা যায়। ফল নেগেটিভ হলেও মাসিক না এলে কয়েক দিন পর আবার পরীক্ষা করুন।
তীব্র তলপেটব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক রক্তপাতের সঙ্গে মাসিক বন্ধ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
আপনার মাসিকের চক্রে যদি নিয়মিত বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপমুক্ত জীবন এবং সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি।