পাটকে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হয়। কিন্তু সর্বাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এটি তার অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছিলো। সকল বাধা-প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে পাট নিজ কক্ষপথে ফিরতে শুরু করেছে। যা দেশীয় উৎপাদিত পণ্য অতীত ঐতিহ্যে ফেরার বার্তা দিচ্ছে। মূলত, পাট ও পাটজাত পণ্যের এখন দুর্দিন মনে করা হলেও এখন রপ্তানি বাণিজ্যে পাট ও পাটপণ্যের গুরুত্ব কমে নি। টানা চার বছর পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি কমার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। যদিও করোনাকালের রেকর্ড রপ্তানি থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে খাতটি।
এক দশক পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের কাছাকাছি থাকলেও করোনাকালে অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে একলাফে তা ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, যা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তারপর টানা চার বছর খাতটির রপ্তানি কমেছে। তবে সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি পৌনে ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলার। এই রপ্তানি গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বন্যার কারণে গত বছর পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যায়। উচ্চ মূল্যের কারণেই অর্থের হিসাবে পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। তবে পরিমাণের দিক থেকে রপ্তানি বাড়ে নি। যদিও পরিমাণের দিক থেকেও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সে জন্য কাঁচাপাটের সরবরাহব্যবস্থা মসৃণ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষণা ও পণ্যের মান উন্নয়নের পাশাপাশি যৌথভাবে হলেও এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বস্তত, বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। বছরে দেশে ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। পাটপণ্যের রপ্তানি ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যদিও রপ্তানি বাড়াতে করণীয় বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ সরকারের দিক থেকে দেখা যায় নি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি পাটের সুতা, বস্তা ও বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্য তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। বিদায়ী অর্থবছর কাঁচা পাটের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে কাঁচা পাটের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে ৩৮ হাজার টন কাঁচা পাট রপ্তানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন।
বিদায়ী অর্থবছরে পাটের বস্তার রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে; আর পাটের সুতার রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলার হয়েছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে পাটের সুতার রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়। তার আগের অর্থবছর রপ্তানি হয়েছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন।
বিশ্বজুড়ে পাটজাত পণ্য, বিশেষ করে বহুমুখী পাটপণ্যের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকলেও সেই রপ্তানি কম বাংলাদেশের। বিদায়ী অর্থবছর ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। উদ্যোক্তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বহুমুখী পাটপণ্যের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রয়াদেশ কমেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। মূলত জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে নিত্যপণ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। তা ছাড়া কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে। সে জন্যও ক্রয়াদেশ কিছুটা কমেছে। জানা যায়, বৈশ্বিক বাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্যের চাহিদার পাশাপাশি পাটের তৈরি শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, গার্ডেনিং বা বাগান, অটোমোবাইল ও প্যাকেজিংয়ে পাটপণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এ ছাড়া পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও রয়েছে চীনসহ বিভিন্ন দেশে।
মূলত, পাট ও পাটজাত পণ্য নতুন করে সম্ভবনা জাগিয়েছে। ফলে পাটের সুদিন ফিরে আশার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই পাটের অতীত গৌরব ফিরে আনতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করাও জরুরি। পাটের বহুমুখী ব্যবহারও নিশ্চিত করা দরকার। তাহলে সোনালি আঁশের সোনালি দিন ফিরে আসবে।
