বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন ইলন মাস্ক বহু বছর ধরে টেসলা ও স্পেসএক্সকে বিশাল দুটি প্রযুক্তি সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এবার প্রতিষ্ঠান দুটিকে একীভূত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে মাস্ক ইতিবাচক উত্তর দেন। সম্ভাব্য একীভূতকরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে ইতোমধ্যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এই একীভূতকরণ নিশ্চিত নয় এবং এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
টেসলার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং স্পেসএক্সের মূল্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে প্রতিষ্ঠান দুটি একীভূত হলে তা ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক একীভূতকরণ হবে। এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করতে শেয়ারহোল্ডারদের সমর্থন প্রয়োজন হবে। মাস্কের মতে, প্রতিষ্ঠান দুটিকে এক ছাতার নিচে আনলে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব।
একীভূতকরণের সম্ভাবনা কতটা?
বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দ্য ফিউচারাম গ্রুপের প্রধান প্রযুক্তি উপদেষ্টা ডেভিড নিকোলসনের মতে, একীভূতকরণটি হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। তাঁর মতে, প্রশ্নটি এখন শুধু—কবে এটি ঘটবে।
গত সপ্তাহে আলোচিত বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার টেসলা রোডস্টারের নতুন সংস্করণ প্রদর্শন করা হয়। এতে স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তির আদলে থ্রাস্টার ব্যবহারের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। নিকোলসনের মতে, গাড়িটি মাস্কের দুই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে।
টেসলা ও স্পেসএক্স—উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাস্ক। তাঁর মতে, চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি যেভাবে কাজ করছে, তাতে তাদের একীভূতকরণে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
সম্ভাব্য একীভূতকরণের মাধ্যমে টেসলার গাড়ি, রোবট ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার প্রযুক্তির সঙ্গে স্পেসএক্সের রকেট, ডেটা সেন্টার, স্যাটেলাইট ও টেলিযোগাযোগ কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ মঙ্গলে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানববসতি গড়ে তোলার বিষয়ে মাস্কের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে সংশয় যেমন রয়েছে, তেমনি সমর্থনও আছে।
গত এক বছরে মাস্ক তাঁর বিভিন্ন ব্যবসাকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। চলতি বছর স্পেসএক্সের পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি তাঁর মালিকানাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সকে অধিগ্রহণ করে।
তবে শেষ পর্যন্ত টেসলা ও স্পেসএক্সের একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের ওপর। চুক্তিটি পাস করাতে টেসলার মোট শেয়ারের অন্তত অর্ধেকের সমর্থন প্রয়োজন হবে। মাস্ক নিজেই এটিকে বড় বাধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হওয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তিনি বিশেষ কমিটির আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান টেলোস ওয়েলথ অ্যাডভাইজর্সের বিনিয়োগ বিশ্লেষক ড্যান শিহানের মতে, টেসলার বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে মাস্ক আগামী কয়েক বছরে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হতে পারেন।
শিহানের মতে, প্রতিষ্ঠান দুটির প্রযুক্তি পরস্পরের পরিপূরক হওয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা শেষ পর্যন্ত চুক্তিটিকে সমর্থন করতে পারেন। তবে একীভূতকরণ হলে টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তুলনামূলক বড় ও জটিল একটি প্রতিষ্ঠানের ছোট অংশের মালিক হবেন।
তিনি বলেন, টেসলার মতো একটি পাবলিক কোম্পানির মূল্যায়ন কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে বাস্তব কোনো নজির নেই।
শেয়ারবাজারে প্রতিক্রিয়া ও প্রযুক্তিগত প্রভাব
একীভূতকরণের সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষ হওয়ার পর স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ এবং টেসলার শেয়ারের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠান দুটি একীভূত হলেও নিকট ভবিষ্যতে টেসলার গাড়িচালকেরা বড় কোনো পরিবর্তন দেখতে পাবেন না।
দ্য ফিউচারাম গ্রুপের প্রযুক্তি উপদেষ্টা ডেভিড নিকোলসনের মতে, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রযুক্তি একত্র করার বিশাল সম্ভাবনার তুলনায় গাড়ি উৎপাদনের বিষয়টি গৌণ হয়ে যেতে পারে।
টেসলাতেও ইতোমধ্যে পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, তুলনামূলক কম জনপ্রিয় মডেলগুলোর পরিবর্তে বেশি বিক্রি হওয়া মডেল ওয়াই ও মডেল থ্রির ওপর গুরুত্ব দেবে তারা। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার একটি উৎপাদনকেন্দ্রকে অপটিমাস নামে পরিচিত মানবসদৃশ রোবট তৈরির কাজে ব্যবহার করা শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিনিয়োগ বিশ্লেষক শিহানের মতে, টেসলার স্বয়ংচালিত গাড়ি ও রোবটের সঙ্গে স্পেসএক্সের এআই এবং স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সমন্বয় ঘটলে গাড়িগুলো আরও উন্নত হতে পারে। তবে নতুন প্রতিষ্ঠানে এআই প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়লে গাড়ি উৎপাদন কতটা অগ্রাধিকার পাবে, সেটি দেখার বিষয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিনো অটো ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা তু লের মতে, সাম্প্রতিক রোডস্টার প্রদর্শনী থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ভবিষ্যতে টেসলার পণ্যে স্পেসএক্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। এতে আরও বেশি ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে চীনের বিওয়াইডির সঙ্গে টেসলার প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিওয়াইডি টেসলাকে ছাড়িয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে।
একীভূত হলে মাস্কের কী লাভ?
বিশ্লেষকদের মতে, একীভূতকরণে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন ইলন মাস্ক নিজেই। প্রতিষ্ঠান দুটি এক হলে নতুন কোম্পানিতে তাঁর ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়টি বিশেষ কমিটিকে গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শিহানের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ব্যবসাগুলো পরিচালিত হলে মাস্কের পক্ষে নিজের এআই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। এই চুক্তির ফলে তাঁর মোট সম্পদ রাতারাতি বেড়ে যাবে না। তবে তাঁর শেয়ার ও সম্পদের বড় অংশ একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কেন্দ্রীভূত হবে।
অন্যদিকে, দ্য ফিউচারাম গ্রুপের প্রযুক্তি উপদেষ্টা নিকোলসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মাস্ককে ঘিরে বিতর্ক থাকায় একীভূতকরণের ফলে তাঁর ব্যবসার ওপর সরকারি নজরদারি বাড়তে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মাসের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাস্কের সমালোচক ডেমোক্র্যাটরা বেশি আসন পেলে একীভূতকরণটি আইনি ও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারে। তবে অতীতেও বিনিয়োগকারীরা মাস্কের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গত বছর টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তাঁর জন্য রেকর্ড পরিমাণ পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন করেছিলেন।
নিকোলসনের মতে, এই চুক্তিতে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ কতটা বাড়বে বা কমবে, তা নিয়ে মাস্ক খুব একটা চিন্তিত নন। বরং তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য—মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ে তোলা—বাস্তবায়ন সহজ করাই এই একীভূতকরণের পেছনে বড় প্রেরণা হতে পারে।
