সংবিধান সংস্কারের নামে সরকার জাতীয় সংসদে অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, এ প্রক্রিয়া জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। সরকারের উচিত বেআইনি পথ থেকে ফিরে এসে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আজকের এই আলোচনা সভায় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী মূল্যবান আলোচনা করেছেন। আমার মনে হয়, জাতির কাছে আর বেশি কিছু বোঝানোর প্রয়োজন নেই। জনগণ এখন বুঝে গেছে, সরকার তার পায়ের তলার মাটি সরে যেতে দেখে আবোল-তাবোল বলে প্রতারণার মাধ্যমে জাতিকে কোন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
তিনি বলেন, “আজকে বিশেষ কমিটির নামে পার্লামেন্টে সালাহউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের নামে যে অপচেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে বসে জুলাই সনদের সঙ্গে বেইমানি হয়—এমন নতুন নতুন চিন্তাচর্চা করছেন। নানান লোকের সঙ্গে আলোচনায় আপনারা এখন জাতির সামনে নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করছেন। স্পিকারকে দিয়ে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান করা যায় কি না, অমুক কিছু করা যায় কি না—এমন নতুন নতুন চিন্তা করছেন, যা জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”
সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, “সালাহউদ্দিন সাহেব পার্লামেন্টে যে কমিটি গঠন করে আজকে তার সভাপতিত্ব করছেন এবং যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, আইনের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের সংবিধানের দৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। আপনি কেন এই কাজ শুরু করেছেন?”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে, যেকোনো প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার বা অর্ডিন্যান্স বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আইনের মর্যাদা পাবে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর যে প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার হয়েছিল, সেই আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, গণভোট এবং জাতীয় ভোটের বিষয়গুলো সন্নিবেশিত ছিল। এর প্রায় ১২ দিন পরে ২৫ নভেম্বর গণভোটের জন্য একটি অর্ডিন্যান্স হয়েছিল। এই দুটি আদেশই আইনের মর্যাদা পায়।”
জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “পুরো জুলাই সনদের ভিত্তিতে ভোট হয়েছে চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। জুলাই সনদে সম্মতি এবং এই গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুমোদিত হয়েছে। বিএনপির দেওয়া সব নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে খারিজ হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “এখন সংবিধান সংস্কার করতেই হবে। ১৩ নভেম্বরের আইনি কাঠামো রাষ্ট্রপতির আদেশে দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে ১৮০টি কার্যদিবসে এই পরিষদ সংবিধান সংস্কার করতে পারে। অন্য কোনো ফোরাম বা বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের কাজ করা সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”
বিরোধী দলের সহযোগিতা নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “আপনি এখন সেখানে গিয়ে বলছেন, বিরোধী দল সহযোগিতা করে না। উচ্চকক্ষে আপনার স্পিকারকে উপরাষ্ট্রপতি করলে কেমন হয়, আপনার স্পিকারকে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান করলে কেমন হয়—এমন নতুন নতুন চিন্তা ও ন্যারেটিভ তৈরি করছেন। আপনার সাগরেদদের নিয়ে যে চিন্তাভাবনার জন্ম দিচ্ছেন, তাতে আপনি সম্পূর্ণ বেআইনি কাজে লিপ্ত হয়েছেন।”
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “জনগণের সঙ্গে আর প্রতারণা করা যাবে না। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে পার্লামেন্টে আসুন। সময় আছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকুন। সেখানেই পুরো জুলাই সনদ গণভোটে পাস হয়েছে, সব নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়ে গেছে। এখন আর কোনো কমিটি লাগবে না। এই কমিটি জনগণ করে দিয়েছে, সেটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ।”
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, “আপনি বেআইনি পথ থেকে ফিরে আসুন। বিরোধী দলের ওপর নিজের ব্যর্থতার দায় চাপাবেন না। আমাদের নেতা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এই জুলাই সনদ আপনি সংস্কার করুন। বিরোধী দল সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে। কেন আপনি বিরোধী দলকে দায়ী করছেন? আপনার অন্যায়কে সহযোগিতা করার জন্য পার্লামেন্টের বিরোধী দল কোনো ভূমিকা পালন করবে না।”
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জুলাই সনদ আমরা ১৭ অক্টোবর ২০২৫ সালে স্বাক্ষর করেছিলাম। সেখান থেকে চার মাস চলে গেছে। নির্বাচন হয়েছে, আপনারা মন্ত্রী হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ক্ষমতায় বসে কোনো দিন এই রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। একই দিনে দুটি ভোট হলো। একটি মেনে নিয়ে মন্ত্রিত্বের স্বাদ নিলেন, আরেকটি অস্বীকার করলেন। নিজের অবস্থান অস্বীকার করার চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছু হতে পারে না।”
