বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া, চকলেট-চিপস-বিস্কুট খাওয়া আর নানা গল্পে মেতে থাকার দিনগুলো আজও ভুলতে পারেনি আশামণি। ছোট্ট মেয়েটিকে বাবা বলতেন, ‘তোমাকে পুলিশ অফিসার বানাব মা।’ কিন্তু চার বছর বয়সেই সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারায় সে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১২ বছর। বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে বেড়ে ওঠা আশামণির চোখে আজও জল আসে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে। তবে কান্না আর কষ্টের মাঝেও বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে। তার স্বপ্ন, একদিন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে বাবার ইচ্ছা পূরণ করবে, মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে।
আজ ২২ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ দিবসে আশামণির জীবনের গল্প সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নাসিক ২ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল আলী পুল এলাকার বাসিন্দা আশামণি। বর্তমানে তার বয়স ১৫ বছর ১০ মাস। মিজমিজি পশ্চিমপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ভোকেশনাল শাখায় পড়াশোনা করছে সে। একদিকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, অন্যদিকে বাবাকে হারানোর শূন্যতা—সবকিছুর মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কিশোরীটি।
আশামণির বাবা আয়নাল হক পেশায় ছিলেন রিকশাচালক। ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রতিদিনের মতো রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। দিনভর রিকশা চালিয়ে রাত ১০টার দিকে দুই যাত্রী নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়া থেকে মৌচাক এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় পৌঁছালে একটি দূরপাল্লার নাইট কোচ রিকশাটিকে ধাক্কা দেয় বলে জানান তাঁর স্ত্রী শিরিন বেগম। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন আয়নাল হক। আহত হন রিকশার দুই যাত্রীও।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন আয়নালকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত দুইটার দিকে রিকশার গ্যারেজের মালিকের মাধ্যমে খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান শিরিন বেগম। সেখানে গিয়ে দেখেন, তাঁর স্বামী গুরুতর আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। দুর্ঘটনায় আয়নালের ডান পা ভেঙে যায়, ডান চোখ চোখের কোটর থেকে বের হয়ে আসে এবং কয়েকটি দাঁত পড়ে যায়। তিন দিন বেঁচে থাকলেও গুরুতর আঘাতের কারণে তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন শিরিন বেগম। আগে থেকেই ঋণগ্রস্ত পরিবারটি হঠাৎ করেই চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হলে মা-মেয়েকে আশ্রয় নিতে হয় ভাড়া বাসায়। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জের আব্দুল আলী পুল এলাকার মৃত সফিউল্লাহ মাস্টারের বাড়িতে মাসে চার হাজার টাকা ভাড়ায় থাকেন তাঁরা।
মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন শিরিন। সেই সামান্য আয়ে ঘরভাড়া, খাবার ও মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। অভাবের কারণে অনেক সময় তিন বেলার পরিবর্তে এক বেলা খাবার খেয়েও দিন পার করতে হয়েছে মা-মেয়েকে।
একসময় অর্থাভাবে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন শিরিন বেগম। কিন্তু আশামণির অদম্য ইচ্ছা তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং বাবার স্বপ্ন পূরণের ব্যাপারে কোনোভাবেই হাল ছাড়তে রাজি হয়নি সে।
পরে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহযোগিতায় সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় আশামণি। ওই সাংবাদিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনা বেতনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন বলে জানান শিরিন বেগম।
সিদ্ধিরগঞ্জের আব্দুল আলী পুল এলাকার ভাড়া বাসায় কথা হয় আশামণি ও তার মা শিরিন বেগমের সঙ্গে। বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে আশামণি।
সে বলে, ‘বাবা আমাকে বলতেন, তোমাকে পুলিশ অফিসার বানাব মা। বাবা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে চকলেট, চিপস, বিস্কুট কিনে দিতেন। সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। তখন কান্না আসে। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না।’
মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে শিরিন বেগম বলেন, বাবার কথা মনে পড়লে আশামণি একা একা কাঁদে। বাবার ছবি বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে। ছোট্ট বয়সে বাবাকে হারানোর কষ্ট সে আজও ভুলতে পারেনি।
আশামণির স্বপ্ন শুধু পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া নয়। বাবার আরেকটি স্বপ্নও মনে গেঁথে আছে তার—পরিবারের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করা। একদিন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি মায়ের কষ্ট দূর করতে চায় সে।
সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারানোর বেদনা থেকে আশামণির প্রত্যাশা, তার মতো আর কোনো সন্তান যেন এভাবে বাবাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে না পড়ে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানায় সে।
বাবার সেই স্বপ্ন আজও আশামণির পথচলার প্রেরণা। অভাব আর বেদনার সঙ্গে লড়াই করে তার এগিয়ে চলা যেন এক নীরব প্রতিজ্ঞা—একদিন সে পুলিশ কর্মকর্তা হবে, পূরণ করবে বাবার স্বপ্ন, মুছে দেবে মায়ের চোখের জল।
