কোজাগরী পূর্ণিমা এলেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা। কিন্তু বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের ঘোষগ্রামে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বাড়িতে বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন নেই। বরং ব্যক্তিগত পুজোর পরিবর্তে গোটা গ্রামের মানুষ একত্রিত হন গ্রামের প্রাচীন মন্দিরে। শুধু ঘোষগ্রাম নয়, আশপাশের প্রায় ৫২টি গ্রামের মানুষের কাছেও এই মন্দিরের লক্ষ্মীপুজো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রাচীন ঐতিহ্য, সাধকের সাধনা এবং নানা লোককথার মেলবন্ধনে এই পুজো আজও স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ঘোষগ্রামে লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাস দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। রাজা হর্ষবর্ধনের সময়কাল থেকেই এই আরাধনার সূচনা বলে মনে করেন অনেকে। যদিও এই প্রাচীনত্বের পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথির উল্লেখ নেই, তবু বংশপরম্পরায় চলে আসা বিশ্বাস ও রীতিনীতি এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর নাম।
প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, দেবী সাধনার উপযুক্ত স্থান খুঁজতে খুঁজতে তিনি রাঢ় বাংলার এই অঞ্চলে এসে পৌঁছন। কিছুদিন বীরচন্দ্রপুরের একচক্রধামে থাকার পর বর্ষার সময় নদী পেরিয়ে ঘোষগ্রামে আসেন তিনি। ক্লান্ত সাধক আশ্রয় নেন একটি নিমগাছের তলায়। সেখানেই শুরু হয় তাঁর সাধনা। লোকবিশ্বাস, দীর্ঘ সাধনার পর স্বপ্নে দেবী লক্ষ্মীর দর্শন পান কামদেব ব্রহ্মচারী। দেবী তাঁকে ওই স্থানেই নিজের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে আরাধনা শুরু করার নির্দেশ দেন। কিন্তু দেবীর মূর্তি তৈরি হবে কীভাবে? সেই প্রশ্নের উত্তরও নাকি মেলে এক অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
কথিত আছে, সজল ঘোষ নামে গ্রামের এক কৃষক পুকুরে ভাসতে থাকা একটি শ্বেতপদ্ম তুলতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হন। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি সাধকের শরণাপন্ন হন। এরপর কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সাধক ও ওই কৃষক একসঙ্গে পুকুর থেকে শ্বেতপদ্ম এবং একটি ভাসমান কাঠখণ্ড সংগ্রহ করেন। সেই কাঠের উপর গঙ্গামাটি লাগিয়ে তৈরি করা হয় দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ঘোষগ্রামে শুরু হয় লক্ষ্মী আরাধনা বলে জনশ্রুতি রয়েছে।পরবর্তীকালে এই পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের কান্দির রাজাও এই পুজোর কথা জানতে পেরে ঘোষগ্রামে মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীপুজোকে ঘিরে রয়েছে আরও এক ব্যতিক্রমী কাহিনি। স্থানীয় লোকবিশ্বাস, একসময় এই গ্রামে ধানের পরিবর্তে সরাসরি চাল ফলত। দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় গ্রামটি ছিল শস্য ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যেত দেবীর প্রতিমাতেও। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমায় চালের শিষ রাখার রীতি প্রচলিত ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবনে লক্ষ্মীকে শস্য, প্রাচুর্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। সেই বিশ্বাসই ঘোষগ্রামের পুজোকে ঘিরে নানা লোককাহিনির জন্ম দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
রীতিনীতির দিক থেকেও এই পুজোর রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোজাগরী পূর্ণিমা উপলক্ষে সকাল থেকেই শুরু হয় বিশেষ পুজো-অর্চনা। দেবীর আরাধনায় ব্যবহৃত হয় নবঘট অর্থাৎ ন’টি ঘট। রাতে আয়োজন করা হয় মহাযজ্ঞ। সেই যজ্ঞে ১০৮টি ক্ষীরের নাড়ু আহুতি দেওয়ার রীতি রয়েছে। তবে অন্যান্য অনেক পুজোর মতো এখানে যজ্ঞে বেলপাতা আহুতি দেওয়া হয় না।মন্দিরে সারা বছর নিত্যপুজো হলেও নির্দিষ্ট সময়ে মন্দির বন্ধ রাখার প্রথাও রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের ২৮ তারিখ থেকে কার্তিক মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত চার দিন দেবী জগৎ পরিক্রমায় বের হন। সেই সময় মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। কোনও বছর এই সময়ের মধ্যে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পড়লে প্রচলিত নিয়ম মেনে পুজোও করা হয় না বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
উৎসবের আবহে বাড়িতে বাড়িতে লক্ষ্মীর আসন সাজানো বাংলার চিরাচরিত ছবি। কিন্তু ঘোষগ্রামে সেই পরিচিত রীতি নেই। এখানে দেবীর আরাধনা ঘিরে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পরিবর্তে গুরুত্ব পেয়েছে সমবেত উপাসনা। গ্রামের প্রাচীন মন্দিরকে কেন্দ্র করেই একত্রিত হন ভক্তরা। আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণে এই পুজো পরিণত হয়েছে বৃহত্তর জনপদের এক মিলনোৎসবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামের সামাজিক ঐক্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। তবু ঘোষগ্রামে লক্ষ্মীপুজোর সেই প্রাচীন ধারাকে আঁকড়ে রেখেছেন বাসিন্দারা।বাংলার উৎসবের মানচিত্রে ঘোষগ্রামের এই পুজো তাই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। যেখানে বাড়ির চৌকাঠে নয়, গোটা গ্রামের সম্মিলিত বিশ্বাসে অধিষ্ঠিত দেবী লক্ষ্মী। আর সেই বিশ্বাসের টানেই কোজাগরী পূর্ণিমায় এক মন্দিরের ছায়াতলে মিলিত হন অসংখ্য মানুষ।
