কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক বন্দিদের আটক, জোরপূর্বক শ্রম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘে চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, কিউবার জনগণের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টি আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বিনা চ্যালেঞ্জে তুলে ধরতে দেওয়া হবে না। নিউইয়র্কের ফরেন প্রেস সেন্টারে কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক সংস্থা ফ্রিডম হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ফ্লাই।
ওয়াল্টজ বলেন, কিউবার সরকার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যে প্রস্তাব উত্থাপন করে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য দায় এড়ানোর একটি প্রচেষ্টা। কিউবার জনগণের দুর্ভোগের জন্য দেশটির কর্তৃত্ববাদী সরকারই দায়ী।
তিনি বলেন, কিউবার সাবেক রাজনৈতিক বন্দি, মানবাধিকারকর্মী ও স্বাধীন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা সরাসরি জাতিসংঘের কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ও প্রমাণের মাধ্যমে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে জেমি ফ্লাই বলেন, ফ্রিডম হাউসের বৈশ্বিক স্বাধীনতা সূচকে কিউবা দীর্ঘদিন ধরে ‘মুক্ত নয়’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। ১০০ নম্বরের সূচকে দেশটির স্কোর মাত্র ৯ এবং রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে স্কোর শূন্য। প্রিজনার্স ডিফেন্ডার্স নামের একটি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কিউবায় এখনো ১,৩০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী ছাড়াও শিল্পী, সাংবাদিক এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার সাধারণ নাগরিক রয়েছেন।
তিনি বলেন, খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের সংকট নিয়ে প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি জানানো ব্যক্তিরাও সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। ফ্লাই বিশেষভাবে সংগীতশিল্পী মাইকেল কাস্তিয়ো পেরেজ এবং রাজনৈতিক কর্মী ফেলিক্স নাভারো ও তার মেয়ে সাইলি নাভারোর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। কারাবন্দি সংগীতশিল্পী কাস্তিয়ো পেরেজকে সম্প্রতি কারাগারে নিরাপত্তা অভিযানের সময় জোরপূর্বক চুল কাটানোসহ দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
কিউবার বিদেশে চিকিৎসক ও নার্স পাঠানোর কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এসব চিকিৎসাকর্মীকে বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে কিউবার সরকার জোরপূর্বক শ্রমের একটি ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। চিকিৎসাকর্মীদের উপার্জনের অর্থ সরাসরি তাদের হাতে না দিয়ে সরকারের কাছে নেওয়া হয় এবং দেশে থাকা তাদের পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিউবার সরকার এসব অভিযোগের বিষয়ে কী বক্তব্য দিয়েছে, তা এই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
ওয়াল্টজ আরও বলেন, কিউবার সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির সাধারণ মানুষ যখন খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে ভুগছেন, তখন ক্ষমতাসীন অভিজাতদের কাছে এসব সুবিধা বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রসঙ্গে ওয়াল্টজ বলেন, আসন্ন ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের ভোটের আগে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। কিউবার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে দেশগুলোকে তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হবে। তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে কিউবান নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং বিদেশে চিকিৎসাকর্মী পাঠানোর ব্যবস্থার মধ্যে তুলনা টানেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে কিউবার সরকার আর্থিক সুবিধা পায়। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও অর্থপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রমাণ সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়নি। ওয়াল্টজ বলেন, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন—জাতিসংঘ সনদের এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিউবার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া মানবিক সহায়তা প্রকৃত অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ১০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তা ছাড় করেছেন, যা ক্যাথলিক চার্চসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণের কথা। তবে ওয়াল্টজের অভিযোগ, এই সহায়তা বিতরণেও কিউবার সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা পৌঁছানো এবং নাগরিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
সংবাদ সম্মেলনে ১৯৯৬ সালে ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামের সংগঠনের দুটি বেসামরিক বিমানে হামলার ঘটনায় কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফ্লোরিডায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রসঙ্গও ওঠে।ওয়াল্টজ বলেন, ঘটনাটির বিচার ও জবাবদিহি দীর্ঘদিনের দাবি। এ বিষয়ে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে আইনি পদক্ষেপের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জাতিসংঘে দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। তবে কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং মার্কিন অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান কী হবে, তা আসন্ন জাতিসংঘের ভোটে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
