বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটা অদ্ভুত সমীকরণ বেশ পুরোনো! বিদেশি কোচের হাতে দায়িত্ব থাকলে প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশছোঁয়া, আর দেশি কোচদের বেলায় ব্যর্থতার দায় যেন একটু বেশিই চেপে বসে। দল জিতলে কৃতিত্বের আলোয় দেশি কোচদের দেখা যায় কম, কিন্তু হারলেই সমালোচনার তির ছুটে যায় তাদের দিকে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতা নিয়েই এবার সরব হলেন তাসকিন আহমেদ। সতীর্থদের পাশাপাশি জাতীয় দলের দেশি কোচদের পক্ষেও কথা বললেন এই পেসার।
একসময় বাংলাদেশ দলের কোচিং প্যানেল বিদেশিদের উপস্থিতিতে বেশ ভারী থাকত। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র! এখন মোহাম্মদ আশরাফুল, তালহা জুবায়েরের মতো সাবেক ক্রিকেটাররা জাতীয় দলের কোচিংয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে যে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, তা কি পাচ্ছেন তারা? অন্তত সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, পারফরম্যান্স খারাপ হলেই দেশি কোচদের দিকে আঙুল তোলার প্রবণতা বেশ প্রবল।
বিশেষ করে ব্যাটিং ব্যর্থতার দায় গত কয়েক মাসে বেশি করে পড়েছে মোহাম্মদ আশরাফুলের ওপর। অথচ ব্যাটিং ইউনিটের সঙ্গে কাজ করছেন প্রধান কোচ ফিল সিমন্স এবং নতুন দায়িত্ব পাওয়া মালিবংওয়ে মাকেতাও। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয় কিংবা দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের মতো সাফল্যে আশরাফুলের অবদানের আলোচনা তুলনামূলকভাবে কমই হয়েছে।
বোলারদের পারফরম্যান্স ভালো থাকায় এখনো তালহা জুবায়েরকে খুব একটা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়নি। তবে দলের ফলাফল খারাপ হলে কোচিং স্টাফের দেশি সদস্যদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর যে প্রবণতা, সেটি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তাসকিন।
জিম্বাবুয়ের কাছে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাসকিন স্পষ্ট করেছেন, কোচ দেশি না বিদেশি, সেটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। তার মতে, ক্রিকেটের মৌলিক বিষয়গুলো সবার জন্যই এক। বিদেশি কোচ এলেই রাতারাতি দলের চেহারা বদলে যাবে, এমন প্রত্যাশারও যৌক্তিকতা নেই।
তাসকিন বলেন, ‘কোচিং স্টাফ দেশি বা বিদেশি হোক বেসিক থিওরি একই। বিদেশি কোচ এলেই দুনিয়ার সব উল্টায় যাবে তা না। দেশি কোচরাও যথেষ্ট ক্যাপেবল যারা আছে। তারা নিজেরাও ভালো পর্যায়ে খেলেছে এবং ভালোভাবে কোচিং করাচ্ছে। আমরা রেজাল্ট অরিয়েন্টেড টিম হওয়ায় এ জিনিস বেশি চোখে পড়ে। হারলে দেশি কোচদের নিয়ে অনেক কথা হয়, জিতলে আবার প্রশংসা কম হয়। এটা দেশি-বিদেশি কিছু না। অল এবাউট রেজাল্ট। জিতলেই সব ঠিক।’
তাসকিনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির একটি পরিচিত প্রবণতা। এখানে অনেক সময় কাজের মূল্যায়নের চেয়ে ম্যাচের ফলাফলই হয়ে ওঠে সবকিছুর মাপকাঠি। জয় এলে ভুলগুলো আড়ালে চলে যায়, আর পরাজয় ঘটলেই শুরু হয় দায় খোঁজার প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় দেশি কোচদের সমালোচনা তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান বলেই মনে করছেন এই পেসার।
অবশ্য জিম্বাবুয়ের কাছে এমন বড় ব্যবধানে হারের পর সমালোচনা এড়ানোর সুযোগ নেই। তাসকিনও বিষয়টি অস্বীকার করছেন না। বরং এই হারকে দেখছেন দলের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ‘রিয়েলিটি চেক’ হিসেবে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন জায়গায় দ্রুত উন্নতি দরকার, সেটি বুঝে নেওয়ার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন তিনি পরাজয়কে।
তবে ব্যর্থতার দায় কেবল ব্যাটারদের কিংবা বোলারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন তাসকিন। তার চোখে ক্রিকেট দলীয় খেলা, যেখানে প্রত্যেকের অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। বোলাররা ভালো করলেও ব্যাটাররা রান তুলতে না পারলে শেষ পর্যন্ত জয় পাওয়া কঠিন। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে সবাইকে।
এ প্রসঙ্গে তাসকিনের ভাষ্য, ‘এটা একটা রিয়েলিটি চেক হয়েছে। কোন কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে। এটা তো ইন্ডিভিজুয়াল গেম না। ২-১ জনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স গোণায় ধরা হয় না যদি জিততে না পারে। দল হিসেবে উন্নতি করতে হবে। ব্যাটার ও বোলার সবার সমান দায়িত্ব। আশা করছি স্মার্টলি কামব্যাক করবে ওরা। তবে দ্রুতই ফিক্স করতে হবে। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে।’
তাসকিনের কথায় তাই শুধু দেশি কোচদের প্রতি সমর্থনই নেই, আছে দলের সম্মিলিত দায়িত্বের বার্তাও। একটি বড় পরাজয়ের পর কে দেশি, কে বিদেশি কিংবা কে ব্যাটার, কে বোলার-এসব বিভাজনের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে নিজেদের ঘাটতি চিহ্নিত করে দ্রুত ফিরে আসা। কারণ দিন শেষে ক্রিকেটে কোচের পরিচয় নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা। তবে সেই পারফরম্যান্সের মূল্যায়নে ন্যায্যতার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই!
