জামালপুর পৌরবাসীর বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করতে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক পানি শোধনাগার ও ওভারহেড ট্যাংক। তবে, চালুর উদ্যোগ নিতেই পানির চাপে বিভিন্ন স্থানে ফেটে যায় পাইপলাইন। এরপর পেরিয়ে গেছে সাড়ে পাঁচ বছর, তবু চালু হয়নি শোধনাগার। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় মরিচা ধরছে মূল্যবান যন্ত্রপাতিতে। অন্যদিকে, বিশুদ্ধ পানির আশায় থাকা পৌরবাসী এখনো বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকল্পের সুফল থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, পানি শোধনাগার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৬৮০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণে খরচ হয়েছে তিন কোটি চার লাখ টাকা। গোপালগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শরিফ অ্যান্ড সন্স ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ করে। পরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর স্থাপনাটি জামালপুর পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে শোধনাগারটি চালু করে পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন স্থানে পাইপলাইন ফেটে যায়। এতে সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর থেকে পাইপলাইনের সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রকল্পটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের পাইপলাইন ও নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণে প্রকল্পটি চালু করা যায়নি। প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষে অন্তত ছয় মাস জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে শোধনাগারটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার কথা। এ সময় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা সমাধান করার বিধান রয়েছে। ঠিকাদার ত্রুটি সংশোধন না করলে জামানতের টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা করার কথা। তবে, পাইপলাইনের সমস্যার সমাধান না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শোধনাগারের মূল ভবন ও ওভারহেড ট্যাংক দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। ভেতরে থাকা অধিকাংশ যন্ত্রপাতি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় সেগুলোর বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি পড়ে থাকলেও সেখান থেকে পৌরবাসীকে এক ফোঁটা পানিও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি চালু করা যাচ্ছে না। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। পৌর এলাকায় বসবাস করেও বিশুদ্ধ পানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পৌরসভার বগাবাইদ এলাকার বাসিন্দা মেহেদী বলেন, পৌরসভায় বসবাস করলেও পানির কোনো সুবিধা পাচ্ছি না। শোধনাগারের কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়ার পর এক দিনও এটি ব্যবহার করা হয়নি। যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই পড়ে আছে।
জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, নির্মাণকাজের সময় অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। সে সময় আওয়ামী লীগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কাজ করেছেন। বর্তমানে পৌরবাসী সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। দ্রুত শোধনাগারটি মেরামত করে পানি সরবরাহ চালু করা প্রয়োজন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুর রহমান বলেন, পাইপলাইন নিম্নমানের হওয়ায় পানির চাপ সহ্য করতে পারেনি। এ কারণে শোধনাগার থেকে সরবরাহ চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। নতুন পাইপলাইন না বসিয়ে পানি সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
জামালপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ জামাল হোসেন বলেন, ২০২২ সালে প্রকল্পটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। হস্তান্তরের সময় তারা দেখে-শুনে নিয়েছিল। পানি সরবরাহ করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাইপলাইন ফেটে যায়। নতুন করে মেরামতের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
