ঢাকা, ১২ অক্টোবর – বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী ও সূচনালগ্নের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ, বিশিষ্ট অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। গত রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন ধরেই তিনি শারীরিক ও বার্ধক্যজনিত নানা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সাত দিন ধরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে উত্তরার ওই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। তার প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও রূপালী পর্দায় পথচলা
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া নাসিমা খানের পৈতৃক নিবাস ছিল মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। পারিবারিকভাবেই ছোটবেলায় নাচের তালিম ও সংস্কৃতিচর্চার সাথে যুক্ত হন তিনি। প্রখ্যাত অভিনেতা ও নির্মাতা খান আতাউর রহমানের পরিবারের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই মূলত রূপালী পর্দায় পা রাখেন তিনি।
ঐতিহাসিক অভিষেক: ১৯৫৯ সালে প্রয়াত পরিচালক এ জে কারদারের সাড়া জাগানো উর্দু সিনেমা ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার।
ষাটের দশকের জনপ্রিয়তা: ষাটের দশকে তিনি বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রে দাপটের সাথে অভিনয় করে ঢাকাই সিনেমার অন্যতম শীর্ষ জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
উল্লেখযোগ্য কাজ: তার অভিনীত নন্দিত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘যে নদী মরু পথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘বেগানা’, ‘উজালা’, ‘তানহা’, ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝান’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’ ইত্যাদি।
স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্র জগৎ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও পরবর্তীতে টেলিভিশন উপস্থাপনা এবং পুনরায় নাটক-সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকের হৃদয়ে চিরসবুজ হয়ে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আজীবন সম্মানিত সদস্যও ছিলেন।
নিখোঁজ ছেলের শোকেই কি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিলেন?
নাসিমা খানের ব্যক্তিগত জীবন নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা ছিল। তার বড় ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সন্তানকে খুঁজে পেতে তিনি আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন এবং নানাভাবে খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান পাননি। প্রিয় সন্তান হারানোর এই গভীর মানসিক আঘাত ও দীর্ঘ কষ্টের মাঝেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই গুণী শিল্পী।
শেষ বিদায় ও সতীর্থদের শোক
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও চিত্রনায়ক সনি রহমানসহ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু তারকা কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অভিনেতা ওমর সানী এক প্রতিক্রিয়ায় গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন—“আন্টি অনেক পুরোনো শিল্পী, ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন; পড়াশোনা ছিল আকাশচুম্বী। আমার সৌভাগ্য হয়েছে তার সাথে অভিনয় করার। আন্টি, আপনার জান্নাত কামনা করছি।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নাসিমা খানের বড় ছেলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তিনি দেশে পৌঁছানোর পরই সম্পন্ন হবে এই বরেণ্য অভিনেত্রীর শেষকৃত্য ও দাফন। আপাতত তার মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি: বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভীত শক্ত করতে এবং সমৃদ্ধ করতে যে কজন নারী অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, নাসিমা খান তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সৃষ্টি ও অভিনয় যুগের পর যুগ মনে রাখবে দেশের সিনেমা প্রেমিরা।
এনএন/ ১২ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::চলে গেলেন বাংলা সিনেমার সূচনালগ্নের কিংবদন্তি অভিনেত্রী নাসিমা খান first appeared on DesheBideshe.