ইরানের সঙ্গে সাময়িকভাবে বাণিজ্যপথ বন্ধ করল কেন পাকিস্তান?
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
ইরানের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে পাকিস্তান। এতে দুই দেশের সীমান্তে প্রায় ২ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)সহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি এবং দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের গাবদ-রিমদান ও তাফতান সীমান্তপথে এ স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিরাপত্তা জোরদার, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকার রোববার জানিয়েছে, সীমান্তপথ দুটি পুনরায় চালু করতে পাকিস্তান ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রশাসনিক সমস্যাগুলোর সমাধান করে দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেন বন্ধ করা হলো সীমান্তপথ?
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা শহিদ রিন্দ জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, চোরাচালান বন্ধ করা এবং আরও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য সাময়িকভাবে বাণিজ্য স্থগিত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত বন্ধের কারণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব প্রত্যাখ্যান করে তিনি জনগণকে যাচাই করা তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানান।
রিন্দ বলেন, দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত শিগগিরই পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সীমান্ত কার্যক্রমের সমন্বয়, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়বে এবং সীমান্তবর্তী এলাকার স্থিতিশীলতা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরান যা বলছে
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, কারিগরি সমস্যার কারণে সীমান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
সীমান্তে আটকা প্রায় ২ হাজার ট্রাক
সীমান্তপথ বন্ধ হওয়ায় পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ডন অনলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলপিজি, চাল, তাজা ফলসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক সীমান্তের উভয় পাশে আটকা পড়েছে।
কোয়েটা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে চলাচলকারী প্রায় ২ হাজার ট্রাক এ পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে সীমান্তবাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত ব্যবসায়ীদের নতুন আমদানি ও রপ্তানি আদেশ স্থগিত রাখার পরামর্শও দিয়েছে তারা।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার একটি স্মারকলিপি জারি করে ৩ অক্টোবরের আগের একটি আদেশ প্রত্যাহার করে। এর ফলে নির্ধারিত সীমান্তপথগুলো দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানার তথ্য অনুযায়ী, রিমদান-গাবদ সীমান্তপথ দিয়ে যাত্রী চলাচল এখনো চালু রয়েছে।
এলপিজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
সীমান্ত বন্ধের ফলে পাকিস্তানের এলপিজি সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। গাবদ-রিমদান সীমান্তপথটি দেশটির জ্বালানি আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পথ দিয়ে প্রতিদিন ৪ হাজার টনের বেশি এলপিজি পাকিস্তানে প্রবেশ করছিল।
ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, সীমান্তপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে করাচিসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে এলপিজি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে খোলাবাজারে এলপিজির দামও বাড়তে পারে।
এদিকে, বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তাফতান সীমান্তপথেও আগে থেকেই নানা সমস্যা চলছিল। নতুন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সীমান্তনির্ভর ব্যবসা, পরিবহন এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা আরও চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগের মধ্যেই স্থগিতাদেশ
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো এবং সীমান্ত যোগাযোগ উন্নত করার উদ্যোগের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এলো।
চলতি বছরের মার্চ থেকে দুই দেশ শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাণিজ্যিক চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
আগস্টে ইরানের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী মোহাম্মদ আতাবাকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করে। এ সময় পাকিস্তান-ইরান যৌথ বাণিজ্য কমিটির দশম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও বৈঠক করে। বৈঠকে পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, শুল্ক প্রক্রিয়ার সমন্বয় এবং সীমান্তপথে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়।
তবে সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা ও বারবার নিরাপত্তাজনিত ঘটনার কারণে সীমান্তবাণিজ্য এখনো নানা বাধার মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এর আগে গোয়াদর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি জিয়ান্দ হুত বলেছিলেন, সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতি এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার কারণে পাঞ্জগুর ও মান্দ-রাদিগ সীমান্তপথে বাণিজ্য কার্যত বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে।
কবে স্বাভাবিক হবে বাণিজ্য?
পাকিস্তান ও ইরানের কর্মকর্তারা সীমান্তপথ বন্ধের সিদ্ধান্তকে সাময়িক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
বেলুচিস্তান সরকার জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে। প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হলে শিগগিরই সীমান্তপথগুলো পুনরায় চালু হতে পারে।
তবে সীমান্ত পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং সীমান্তনির্ভর ব্যবসায় অনিশ্চয়তা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
