থাকছে হাওর, চর ও দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা
জালালাবাদ রিপোর্ট: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। এখানেই একজন শিশুর শিক্ষাজীবনের বীজ রোপণ করা হয়। তাই মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি দীর্ঘদিনের। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে নানান সময় নানান আলোচনা পর্যালোচনা চলমান ছিল।
এরই প্রেক্ষিতে এবার প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মেয়াদ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) বার্ষিক প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বর্তমানের প্রায় সাত হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি পেলেই এ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, মিড-ডে মিল এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদারকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, শিক্ষকদের আধুনিক শিখন পদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস সরাসরি প্রশিক্ষণ নেবেন। এরপর শ্রেণিকক্ষে ফিরে নির্ধারিত সিলেবাস ও মডিউল অনুযায়ী অনলাইন ও অফলাইনে প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করবেন। পুরো প্রক্রিয়া আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বর্তমানে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের নতুন মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ব্যাচগুলো এ মডিউল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পাবে। প্রথম দুই মাস পিটিআইতে প্রশিক্ষণের পর বাকি ১০ মাসের প্রশিক্ষণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইন ও অফলাইনে সম্পন্ন করতে হবে।
পিটিআইগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানের প্রায় সাত হাজার শিক্ষকের বার্ষিক প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগকেও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিÑ কোনো শিক্ষক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না নিয়ে ক্লাসরুমে স্থায়ীভাবে পাঠদানে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না।’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ধরে রাখা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। তার আশা, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও স্মার্ট ক্লাসরুম উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এটি শুধু শিক্ষকদের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়ার প্রকল্প নয়; গুগলসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় শ্রেণিকক্ষের জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গম এলাকার যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই, সেগুলোতে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌরবিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিতের কাজ চলছে।
প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপির অপেক্ষা। এ বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কপি পাওয়ার পর দ্রুত পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু হবে। এটি সম্পন্ন হলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথও উন্মুক্ত হবে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা কমানো, গল্পের মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে আবাসিক বিদ্যালয় চালুর বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
