মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েও ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত গেজেটে নাম না আসায় চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ১০৫ জন প্রার্থী। গত ১৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, যেখানে পিএসসির সুপারিশ করা ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জনের নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাদ পড়া এই প্রার্থীরা এখন রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন এবং অবিলম্বে সম্পূরক গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। দাবি আদায় না হলে তারা শাহবাগে আত্মাহুতির মতো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার পশ্চিম বেজগ্রাম। ভেবেছিলেন, ছেলের মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে। বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল। ওর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছেও খোঁজ নেওয়া হোক।
বঞ্চিত প্রার্থীদের অন্যতম নূরে আলম জানান, তিনি ৪৪তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বর্তমানে সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত। ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পেলেও এবার গেজেটে তার নাম নেই। তিনি বলেন, এর আগে চাকরির ছাড়পত্র পেলেও এবার কেন বাদ পড়লেন, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মৎস্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেক প্রার্থী মনিরুজ্জামান জানান, চার-পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর এই ফলাফল তাদের জন্য অসহনীয়। তারা কোনো করুণা নয়, বরং মেধা দিয়ে অর্জিত চাকরির অধিকার ফিরে পেতে চান। তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো ফৌজদারি মামলা বা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নেই। সে সময় ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমন করা এবং চাকরির নিয়োগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয়তা আছে কি না, তা পরীক্ষা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
প্রার্থীরা সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—পুনঃ প্রজ্ঞাপনের তারিখ ঘোষণা, আইনগত বাধা না থাকলে সম্পূরক গেজেট প্রকাশ, বাদ পড়ার কারণ লিখিতভাবে জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদান এবং প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের জটিল আইনকানুন বা প্রশাসনিক হিসাব–নিকাশ বোঝেন না এই গ্রামীণ নারী। বাবা–মায়ের কাছে কী জবাব দেব, জানি না।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার আলেয়া বেগম তার ছেলে শামীম আল মাহাদীর বাদ পড়ায় গভীরভাবে ব্যথিত। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা শামীম ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েছিলেন। আলেয়া বেগম জানান, গ্রামের বাড়িতে সবাই তার ছেলেকে মেধাবী ও নির্দোষ হিসেবেই জানেন। তিনি সরকারি প্রতিনিধিদের এলাকায় এসে সরেজমিন যাচাই করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। গ্রামের আত্মমর্যাদাশীল ও পরিশ্রমী নারী আলেয়া খানম। বড় মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে সংসারী হয়েছেন, ছোট মেয়ে কলেজে কেবল পা রেখেছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় বাড়িতে নিজস্ব গরুর খামার গড়ে তোলেন আলেয়া খানম। এক বছর আগে যখন খবর এল মেজ ছেলে ৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তখন সন্তানকে নিয়ে গর্ব অনুভব করেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সরকার বাহাদুরের যে কেউ এসে আমাদের এলাকা সরেজমিন যাচাই করুক। মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরেন আলেয়া বেগম। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, বেতন প্রায় দেড় লাখ টাকা।
এই সামগ্রিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।
প্রজ্ঞাপনে নাম না আসা প্রার্থীদের অর্ধেকের বেশি সাময়িকভাবে বাদ পড়েছেন মূলত প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতির কারণে। কিন্তু সেই স্বস্তির স্থায়িত্ব বেশি দিন হয়নি।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকই যেন প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। তাই বাদ পড়া প্রার্থীদের তথ্য পুনর্নিরীক্ষণ বা রি-ভেরিফিকেশন করা হবে এবং যোগ্য বিবেচিতরা নিয়োগ পাবেন। অতীতে ৪৯তম বিসিএসেও গেজেটের পর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অনেকে চাকরি পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। গেজেটের প্রতীক্ষায় কেটে যায় দীর্ঘ ১১টি মাস।
এদিকে ব্রিটিশ আমলের ভেরিফিকেশন প্রথা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তুলেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা আদালতের দণ্ড না থাকলে কেবল রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অজুহাতে তরুণদের ভবিষ্যৎ আটকে রাখা পদ্ধতিগত ত্রুটি। তিনি একে ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, আগের রাজনৈতিক দলীয়করণের জায়গা এখন ‘বিশ্বাসের দলীয়করণে’ রূপ নিয়েছে। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের এভাবে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। কষ্টার্জিত উপার্জনে তিনি তাঁর তিন সন্তানকে শিক্ষিত ও সুনাগরিক করে গড়ে তুলেছেন। ২৪–এর এত বড় ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থান থেকে আমরা তবে কী শিক্ষা নিলাম। আমি বলব, পুরোনো রাজনৈতিক দলীয়করণটি বর্তমানে “বিশ্বাসের দলীয়করণে” রূপান্তরিত হয়েছে। বিসিএসের এই দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভেরিফিকেশনের নামে অসংগতি ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২০-এর দশকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন প্রথা চালু হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ম ব্যবহার করে প্রার্থীর স্বজনদের পরিচয় বা অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ আটকে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
The post ৪৫তম বিসিএসে গেজেট থেকে বাদ: রি-ভেরিফিকেশনের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
