২২ মিনিট আগে
![]()
দীপন নন্দী
প্রতিকী ছবি/ রয়টার্স
থাইল্যান্ডের একটি কারাগারে বন্দি আমজাদ হোসেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহায়তার জন্য গত দুই মাস ধরে সবখানে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন স্ত্রী সুমনা আক্তার।
কিন্তু আমজাদকে ফিরিয়ে আনতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সংবাদ পাননি সুমনা।
কারাগারে স্বামীর বন্দি থাকার খবর তিনি বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশনের কাছ থেকে পাননি। বরং গত সাড়ে তিন মাসে ওই একই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে স্বামীর খোঁজ পান সুমনা।
থাইল্যান্ডের কারাগার থেকে ফেরা ২৪ বাংলাদেশি জানিয়েছেন বন্দি থাকা অবস্থায় নির্যাতন ও পাচারের শিকার হওয়ার নির্মম অভিজ্ঞতার কথা।
পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে ৪১ বছর বয়সী আমজাদ গত বছরের ডিসেম্বরে কাজের আশায় দেশ ছাড়েন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি পাচারের শিকার হয়ে লাওস ও কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঠাঁই পান থাইল্যান্ডের এক কারাগারে।
সেখান থেকে ২৪ বাংলাদেশি দেশে ফেরার সময় তাদের কাছে দিয়েছিলেন স্ত্রীর ফোন নম্বর। তারাই এসে সুমনাকে জানিয়েছেন আমজাদের বর্তমান পরিস্থিতির তথ্য।
৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে রাজবাড়ীতে থাকেন সুমনা। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতার আবেদন জানিয়ে দুই মাস আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করি। আমি স্বামীকে জীবিত ফেরত চাই। তার লাশ চাই না, লাশ দিয়ে কী করব? আমি আর এই মেয়ে ছাড়া এই পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই। আমরা আবার তাকে দেখতে চাই।'
এই পরিবারটির এমন করুণ অভিজ্ঞতাই জানান দেয় বিদেশে বন্দি স্বজনদের তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা ও দেশে ফিরিয়ে আনার সময় তাদের কত ধরনের ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে ১৫ হাজার ২১৩ বাংলাদেশি বন্দি আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে সৌদি আরবে, এরপরেই রয়েছে মালয়েশিয়া ও ভারতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩০ সেপ্টেম্বরের ডেটাবেজ অনুযায়ী, শুধু জেদ্দাতেই অন্তত ৫ হাজার ৪৮০ বাংলাদেশি আটক আছেন।
গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বন্দি আছেন।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ২১৭ জন ও ভারতে ১ হাজার ৪৪৪ বাংলাদেশি বন্দি আছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যে আরও দেখা যায়, দুবাইয়ে ৭৪০ জন, ওমানে ৪০০, লিবিয়ায় ৩১৪, গ্রিসে ৩০৭, কুয়েতে ২৯৬, ভিয়েতনামে ২৫০ এবং থাইল্যান্ডে ১২৭ বাংলাদেশি আটক আছেন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বন্দিদের মধ্যে অনেকে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও অনেকে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বা বৈধ নথিপত্রের অভাবে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে আটক হন।
আটক পরিবারগুলোর অনেকের অভিযোগ, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সৌদি আরবের কারাগারে ৯ মাস বন্দি ছিলেন সিলেটের তিন ভাই। তাদের অভিযোগ, মিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও যে সহায়তা তারা পেয়েছেন, তা একদম না পাওয়ার মতোই।
সিলেট সদরের কালারুকা এলাকার আব্দুর রহমান ২০১৯ সালে সৌদি আরবে যান। এর এক বছর পর তার বড় ভাই রিয়াজ উল্লাহ এবং ২০২৩ সালে ছোট ভাই মোহাম্মদ আলী সৌদি যান।
রিয়াদে থাকার সময় একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তারা গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার আগে তারা টানা ৯ মাস কারাগারে কাটান।
আব্দুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরিবারের কথা ভেবে আমরা দিনরাত কাজ করেছি। তারপর একদিন একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না।'
তার অভিযোগ, মিশনে যোগাযোগ করা হলেও বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিবার তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশে একাধিক মানববন্ধন ও মিছিল করার পর সংশ্লিষ্ট মিশন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
এমনকি মুক্তির পরও দেশে ফেরার টিকিটের জন্য পরিবার থেকে টাকা নিতে হয়। তিন ভাইকে মোট ৬ হাজার সৌদি রিয়াল জোগাড় করতে হয় দেশে ফিরে আসতে।
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কনস্যুলার সহায়তার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের একটি গোপনীয় স্মারক থেকে জানা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া বন্দিদের তালিকায় নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম থাকলেও তাতে তাদের মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মিশনকে তাদের রায় বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে কোনো তথ্য জানায়নি। দুই পরিবারই আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করেনি।
পরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে এবং আদালতের রায়ের কপি পেতে বাংলাদেশ একটি কূটনৈতিক নোট পাঠায় সৌদি কর্তৃপক্ষকে।
কিন্তু তালিকা পাওয়ার পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই সপ্তাহে সাজাপ্রাপ্তদের আইনি অবস্থা মিশন পর্যালোচনা বা ফলোআপ করেছিল কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।
এ ক্ষেত্রে মিশনের ভূমিকা পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ।
মিশন ও সরকারের পদক্ষেপ
বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলো জানিয়েছে, তারা নিয়মিত কারাগার পরিদর্শন করে, আইনি সহায়তা দেয় এবং আটক নাগরিকদের সহায়তায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ মিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান ডেইলি স্টারকে জানান, তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের সমস্যার কথা শোনেন।
তিনি জানান, আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তায় আইনজীবী নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং চুক্তি সই হলেই তারা আদালতে প্রবাসীদের পক্ষে লড়তে পারবেন।
সিদ্দিকুর রহমান আরও জানান, মালয়েশিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের প্রায় ৭০ শতাংশ মামলাই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া সংক্রান্ত। বাকি মামলাগুলো মাদকসংক্রান্ত এবং অপহরণ, চুরি ও হত্যার মতো অভিযোগের।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের দ্বিতীয় সচিব (লেবার) রফিকুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের মিশন আইনি সহায়তা দেয় এবং আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কাজ করে।'
'অনেক মামলায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকে, যা প্রায়ই কফিল বা নিয়োগকর্তাদের দায়ের করা এবং পরবর্তীতে এর বেশিরভাগই মিথ্যা প্রমাণিত হয়,' বলেন তিনি।
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (প্রেস) সাইদুর রহমান জানান, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে কর্মকর্তারা কারাগারে গিয়ে বন্দিদের পরিদর্শনের পাশাপাশি পাসপোর্টবিহীন বন্দিদের জন্য ট্রাভেল পারমিটের ব্যবস্থা করেন।
এদিকে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ মিশনের প্রথম সচিব (লেবার) জহির ইমাম জানান, থাই আইন অনুযায়ী সাজা শেষ হওয়ার আগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো যায় না।
'পরিবার অনুরোধ জানালে বা বন্দিরা আপিল করলে আমরা তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করতে পারি,' বলেন তিনি।
যদিও রাজবাড়ীর আমজাদের পরিবার এখনো তার বিচারের বর্তমান অবস্থা এবং দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে ক্ষমা, সাজা কমানো এবং বন্দিদের মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়।
জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার ২০০ জনের বেশি বাংলাদেশির মুক্তির বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে তিনি বলেন, 'প্রবাসীদের সহায়তা করা মিশনের শ্রম উইংগুলোর দায়িত্ব।'
'যারা সহায়তা পাচ্ছেন না তাদের সরাসরি আমার সঙ্গে বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখব,' বলেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, তার দপ্তরে প্রতিদিনই ইমেইলে এ ধরনের অভিযোগ আসে।
প্রবাসীদের বিদেশ যেতে অতিরিক্ত খরচের জন্য তিনি মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের দায়ী করে। উদ্বেগ প্রকাশ করে শামা ওবায়েদ বলেন, 'বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশে যাওয়ার পর অনেককে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে হচ্ছে লাশ হয়ে বা পঙ্গুত্ব বরণ করে।'
কোনো দেশে রওনা হওয়ার আগেই প্রবাসীদের সে দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন করার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, 'সরকার এসব মামলা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তবে আইনি প্রক্রিয়া ও প্রত্যাবাসনে সময় লাগতে পারে।'
ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ
বিদেশে বন্দি বাংলাদেশিদের খোঁজ রাখতে এবং তাদের প্রত্যাবাসন সহজ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি অনলাইন পোর্টাল বা ডেটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা করছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
ডেটাবেজে বন্দিদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও ভিসার বিবরণ, অপরাধের ধরন এবং সাজার মেয়াদ উল্লেখ থাকবে। সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে একটি সতর্কবার্তা পাওয়া যাবে, যা তাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে সাহায্য করবে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিদেশে আটক বাংলাদেশিরা সাধারণত দুই ধরনের অভিযোগ অভিযুক্ত। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, আর অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা।
'তাদের মামলাগুলো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত এবং বিশেষ করে যারা ফৌজদারি অপরাধের মুখোমুখি, তাদের উপযুক্ত আইনি সহায়তা ও প্রত্যাবাসন সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন,' বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'কোনো পরিবার স্বজনদের আটকের খবর দিলে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্র্যাক। আমরা তাদের ফিরিয়ে আনতে ও পরবর্তীতে কাউন্সেলিংয়ে সহায়তা করি।'
অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে তিনি প্রবাসীদের গন্তব্য দেশের আইন ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বন্দিদের জন্য আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।
