গৌতম রায়
পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের কথা। সময়টা যেন অন্য রকম ছিল। ঘড়ির কাঁটা চলত, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাত, শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াত, কাশফুলের মাথায় হাওয়া দোল খেত, ঢাকের আওয়াজে পুজো আসত, আবার একসময় চলেও যেত। কিন্তু সেই চলে যাওয়ার মধ্যে আজকের মতো এমন একটা তাড়াহুড়ো ছিল না। আনন্দের প্রকাশে এত আড়ম্বর ছিল না, উৎসবের সঙ্গে এত হিসেবনিকেশ জড়িয়ে থাকত না। আর বিজয়া দশমী? সে তো কেবল দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জনের দিন ছিল না, সে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার দিন। ছিল প্রণাম, আশীর্বাদ, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ, বাড়ি বাড়ি যাওয়া, পুরোনো অভিমান ভুলে যাওয়া আর আপনজনদের আরও একবার কাছে পাওয়ার দিন।
মনে পড়ে, দশমীর সকাল থেকেই একটা অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হত। পুজোর চার দিনের হইচই, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা, নতুন জামাকাপড় পরা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা—সব কিছুর মধ্যে হঠাৎ একটা বিষণ্ণতার ছায়া পড়ত। মা দুর্গা এবার চলে যাবে। আবার একটা বছর অপেক্ষা। প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিমার দিকে তাকালে মনে হত, সত্যিই কি মা চলে যাবে? এই যে কয়েকটা দিন ধরে এত আলো, এত মানুষের ভিড়, এত ঢাকের বাদ্যি, এত আনন্দ—সব কি আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যাবে?
কিন্তু সেই বিষাদের মধ্যেও দশমীর নিজস্ব আনন্দ ছিল। বাড়ির বড়রা সকাল থেকেই ব্যস্ত। কোথাও প্রতিমার সামনে সিঁদুরখেলা, কোথাও দেবীকে বরণ, কোথাও বিসর্জনের প্রস্তুতি। পাড়ার ছেলেরা ছুটে বেড়াচ্ছে। কে প্রতিমার সঙ্গে যাবে, কে ঢাকের পেছনে হাঁটবে, কে বিসর্জনের সময় নদীর ঘাটে থাকবে—এই নিয়ে কত উত্তেজনা!
বিসর্জনের শোভাযাত্রা ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। প্রতিমা যখন প্যান্ডেল ছেড়ে বেরোত, তখন মনে হত গোটা পাড়া যেন তার সঙ্গে চলেছে। ঢাকিরা ঢাক বাজাচ্ছেন, কাঁসর ঘণ্টা বাজছে, কেউ জয়ধ্বনি দিচ্ছেন, কেউ আবার চুপচাপ প্রতিমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোটদের চোখে বিস্ময়, বড়দের চোখে মায়া, আর বয়স্কদের মুখে সেই চিরন্তন উপলব্ধি—আসা আর যাওয়ার মধ্যেই তো জীবনের ছন্দ।
বিসর্জনের ঘাটে পৌঁছনোর পর সেই আবেগ আরও গভীর হয়ে উঠত। নদীর জলে আলো কাঁপছে, চারদিকে মানুষের ভিড়, প্রতিমার গায়ে শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নেওয়া। তারপর ধীরে ধীরে জলের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যেত। মনে হতো, এত দিনের পরিচিত একজন আপনজনকে বিদায় জানালাম।
বয়স্কদের প্রণাম করার রীতিটা ছিল বিশেষ আবেগের। বাড়ির বড়দের সামনে গিয়ে মাথা নত করে প্রণাম করতাম। তাঁরা মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতেন। কেউ বলতেন, “সুখে থাকিস, ভাল থাকিস, মানুষের মতো মানুষ হোস।” কেউ বলতেন, “পড়াশোনা করে বড় হবি।” কেউ আবার স্নেহের সঙ্গে গাল টিপে দিতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। সেই আশীর্বাদের ভাষা হয়তো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তার মধ্যে এমন একটা মমতা থাকত, যা আজও মনে পড়লে মন আর্দ্র হয়ে ওঠে।
বাড়ির কাকিমা, পিসিমা, মাসিমা, জ্যাঠাইমাদের কাছে প্রণাম করতে যাওয়ার মধ্যে ছিল অন্য রকম আনন্দ। কেউ কোলে টেনে নিতেন, কেউ বলতেন, “কী রে, এত বড় হয়ে গেছিস!” কেউ আবার নতুন জামাটা দেখে প্রশংসা করতেন। ছোটদের কাছে এসবই ছিল বিজয়ার প্রাপ্তি। প্রণাম করার পর হাতে একটা টাকা গুঁজে দেওয়া হলে তো আনন্দের সীমা থাকত না! সেই টাকা দিয়ে কী কেনা হবে, তা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কত আলোচনা!
তবে বিজয়ার আসল আকর্ষণ ছিল খাওয়াদাওয়া। আজকের মতো বাজার থেকে নানা রকম খাবার কিনে আনার চল সর্বত্র ছিল না। বাড়ির রান্নাঘরেই তৈরি হতো বিজয়ার আপ্যায়নের প্রধান উপকরণ। নারকেল কোরা হচ্ছে, গুড় গলছে, ময়দা মাখা হচ্ছে, সন্দেশ সাজিয়ে রাখা হচ্ছে থালায়। কোথাও নিমকি, কোথাও নাড়ু, কোথাও মুড়কি, কোথাও ঘরে তৈরি গজা কিংবা খাজা। সামর্থ্য ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আয়োজন আলাদা হতো, কিন্তু আপ্যায়নের আন্তরিকতায় তেমন ফারাক থাকত না।
ঘরে তৈরি নারকেলের নাড়ুর স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে। নারকেল আর গুড়ের সেই মেলবন্ধন, মায়ের হাতের পাক, কিংবা পিসিমার তৈরি তিলের নাড়ু—কোনও নামী দোকানের দামি মিষ্টি সেই স্বাদের বিকল্প হতে পারে না। কারণ, সেই খাবারের মধ্যে শুধু উপকরণ ছিল না; ছিল অপেক্ষা, যত্ন, পরিশ্রম আর ভালবাসা।
খাওয়াদাওয়া শেষ হলেই যে বিদায়, তা নয়। বসার ঘরে শুরু হতো গল্প। কে কোথায় চাকরি করছেন, কার ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে, কার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, কার বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে—পরিবারের খবরাখবর চলত অনেকক্ষণ। পুরোনো দিনের স্মৃতি উঠে আসত কথায় কথায়। কোনও এক আত্মীয়ের ছোটবেলার দুষ্টুমি নিয়ে হাসাহাসি, কোনও পুরোনো বিয়ের গল্প, কিংবা বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনও মজার ঘটনা—বিজয়ার আড্ডায় সব কিছুরই জায়গা ছিল।
পাড়ার সম্পর্কও ছিল বড় মধুর। পাশের বাড়ির কাকু, সামনের বাড়ির জেঠু, গলির মোড়ের পরিচিত মানুষটি—সকলেই যেন বৃহত্তর পরিবারের অংশ। ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের ব্যবধান থাকলেও দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্যে এমন অনেক স্বাভাবিকতা ছিল, যা মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসত। হিন্দু বাড়ির বিজয়ার মিষ্টি কোনও মুসলমান প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, আবার ঈদে সেই প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে খাবার আসা—বাংলার বহু পাড়া-মহল্লায় এই আদানপ্রদান ছিল পরিচিত সামাজিক দৃশ্য। সব জায়গায় সমানভাবে না হলেও, যেখানে ছিল, সেখানে তা কোনও আনুষ্ঠানিক সম্প্রীতির প্রচার ছিল না; ছিল একসঙ্গে বেঁচে থাকার অভ্যাস।
বিজয়া মানে শুধু দেবীর বিদায় নয়, মানুষের মনের জড়তা থেকে মুক্তি পাওয়ারও একটা উপলক্ষ। প্রণাম করা মানে শুধু বয়োজ্যেষ্ঠের সামনে মাথা নত করা নয়, তাঁর অভিজ্ঞতা ও স্নেহকে স্বীকার করা। মিষ্টিমুখ করানো মানে শুধু মিষ্টি খাওয়ানো নয়, তিক্ততার বদলে মাধুর্যকে বেছে নেওয়া। আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুভেচ্ছা জানানো মানে শুধু সামাজিক কর্তব্য পালন নয়, সম্পর্কের খোঁজ নেওয়া।
আজ এত বছর পরে সেই দিনগুলির কথা ভাবলে মনে হয়, তখন আমাদের প্রাপ্তি হয়তো কম ছিল, কিন্তু ছোট ছোট আনন্দকে অনুভব করার অবকাশ ছিল বেশি। একটি নতুন জামা, একটি নারকেলের নাড়ু, বড়দের আশীর্বাদ, বন্ধুর সঙ্গে বিসর্জনের পথে হাঁটা, কিংবা কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে বসে দীর্ঘ আড্ডা—এসবই ছিল আনন্দের বড় উপাদান। আমাদের হাতে প্রযুক্তির এত সরঞ্জাম ছিল না, কিন্তু মানুষের মুখোমুখি বসে কথা বলার সুযোগ ছিল। মুহূর্তকে বন্দি করার যন্ত্র ছিল না, কিন্তু মুহূর্তকে মনে ধরে রাখার অবসর ছিল।
এখন সময় বদলেছে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, যাতায়াতের গতি বেড়েছে, খাবারের বৈচিত্র্য বেড়েছে, উৎসবের পরিসরও অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু ব্যস্ততার ভিড়ে কখনও কখনও সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট সময় বের করাটাই কঠিন হয়ে পড়ে। শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় দূরে, অথচ মানুষটির পাশে বসে দুটো কথা বলা হয়ে ওঠে না। ছবি থেকে যায়, কিন্তু ছবির বাইরের মুহূর্তগুলোকে অনুভব করার সুযোগ কমে যায়।
তবু সব হারিয়ে যায়নি। আজও কোনও বাড়িতে বিজয়ার দিনে বয়স্ক মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে, তিনি মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলে, মনে হয় সেই পুরোনো সময়ের দরজা এক মুহূর্তের জন্য খুলে গেল। আজও ঘরে তৈরি নাড়ুর গন্ধে শৈশব ফিরে আসে। আজও কোনও পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় হলে মনে পড়ে যায় কত বছর আগের সেই বিসর্জনের মিছিল।
প্রতিমা বিসর্জনের জলে মিশে যেত। ঢাকের আওয়াজ ক্রমশ দূরে সরে যেত। প্যান্ডেলের আলো নিভে আসত। নতুন জামা তুলে রাখা হতো আলমারিতে। কিন্তু বাড়ির বড়দের আশীর্বাদ, মায়ের হাতের নাড়ু, পিসিমার স্নেহ, বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসা, প্রতিবেশীর দরজায় দাঁড়িয়ে বলা—“শুভ বিজয়া”—এসবের কোনও বিসর্জন হত না।
পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের সেই বিজয়া আজ আমাদের কাছে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের জন্যও এক মানবিক শিক্ষা।
সেই সব হারিয়ে যাওয়া দিনের প্রতি, সেই সব প্রিয় মুখের প্রতি, সেই সব স্নেহমাখা হাতের প্রতি—আমাদের আন্তরিক প্রণাম।
