বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়মকানুনে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। উড়োজাহাজের নিবন্ধন উড্ডয়নযোগ্যতা, পাইলট ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের লাইসেন্স, এয়ারলাইন্স পরিচালনা, বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন, বিমান চলাচলের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে জারি করা হয়েছে ‘বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’। দীর্ঘ ৪২ বছর পর ১৯৮৪ সালের বিধিমালার পরিবর্তে নতুন এই বিধিমালা জারি করা হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের লিখিত অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশের আকাশসীমায় কোনো পাইলটবিহীন উড়োজাহাজ চলাচল করতে পারবে না।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমায় উড্ডয়ন ও অবতরণও করতে পারবে না। বাংলাদেশের বাইরে থেকে আসা কোনো বিমান দেশের কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যতীত
অন্য কোন স্থানে অবতরণে বাধ্য হলে উক্ত বিমানের পাইলটকে অবিলম্বে নিকটস্থ কাস্টমস কমিশনার ও পুলিশ কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে। আবার উড্ডয়নের সময় তাদের অনাপত্তি ছাড়পত্র নিতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কোনো বিমানে কয়েদি পরিবহন করা যাবে না। এ ছাড়া সিভিল অ্যাভিয়েশন চেয়ারম্যান কর্তৃক জারিকৃত সাধারণ বা বিশেষ অনুমতি ও শর্ত প্রতিপালন ছাড়া কোনো প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ বাংলাদেশে আনতে ও বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে নিতে বিমানে পরিবহন করা যাবে না।
গত ১৯ অক্টোবর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে প্রণীত বিধিমালাটি গেজেট প্রকাশের ২১ দিন পর কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে বিমান চলাচলের বিভিন্ন কার্যক্রমের অনুমোদন, সনদ, লাইসেন্স ও তদারকির নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আমাদের সময়কে বলেন, বিধিমালায় বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নানা বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া বিধিমালায় বিমান চলাচলের বিভিন্ন স্তরকে একটি বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
বিধিমালায় উড়োজাহাজের নিবন্ধন, উড্ডয়নযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট সনদের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাইলটসহ বিমান চলাচলের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের লাইসেন্স ও যোগ্যতার বিষয়ও রয়েছে। নিরাপদে উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন বজায় রাখার বিষয়টি এই কাঠামোর অংশ।
বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট বা এওসি, পরিচালনার অনুমোদন, পারমিট, ছাড়পত্র এবং অন্যান্য পরিচালনাগত সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। এসব অনুমোদন ও সনদের মাধ্যমে বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিধিমালায় বিমানবন্দর, এয়ারফিল্ড ও হেলিপোর্টের লাইসেন্স এবং সনদ প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। বিমানবন্দর বা উড্ডয়ন ক্ষেত্রের আশপাশে উড়োজাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে— এমন স্থাপনার বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।
বিধিমালায় আকাশপথে চলাচল, বিমান চলাচলসেবা, যোগাযোগ, আবহাওয়াসংক্রান্ত সেবা এবং ফ্লাইট পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে পরিদর্শনেও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা পরিদর্শকরা সংশ্লিষ্ট নথি ও রেকর্ড পরীক্ষা করতে এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়ন করতে পারবেন। পরিদর্শন বা প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিষয়টিও বিধিমালায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিমান চলাচলের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় উড়োজাহাজের শব্দসংক্রান্ত সনদসহ পরিবেশগত বিষয়ও বিধিমালায় রয়েছে। অর্থাৎ পরিচালনাগত অনুমোদনের পাশাপাশি প্রযোজ্য পরিবেশগত শর্ত ও সনদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, বিমানবন্দর, বিমানঘাঁটি ও হেলিপোর্টের নিরাপদ পরিচালনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে— এমন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে বিধিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন স্থাপনা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিধিমালায় দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিমানঘাঁটির লাইসেন্স ও সনদসংক্রান্ত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে এসব স্থাপনার লাইসেন্স ও সনদ থাকতে হবে। বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার এবং উড্ডয়ন-অবতরণের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বিধিমালার শর্ত অনুসরণের কথা রয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো দেশি বা বিদেশি বিমান পরিবহনকারী, বিমান অপারেটর বা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো প্রকার অ্যারোনটিক্যাল বা নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ, ফি, ভাড়া বা অন্য কোনো পাওনা বকেয়া রাখলে, উক্ত বকেয়া সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কোনো নতুন বা অতিরিক্ত ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি অনুমোদন, এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট প্রদান, নবায়ন বা সংশোধন, ফ্লাইট পরিচালনার জন্য কোনো নতুন অনুমোদন, পারমিট, ক্লিয়ারেন্স বা অন্যান্য অপারেশনাল সুবিধা প্রদান, অথবা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো অনুমোদন বা সুবিধা প্রদান করবে না। তবে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, উক্ত বিধান প্রতিপালন হতে অব্যাহতি প্রদান করতে পারবে।
বিধিমালায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ এবং বিমানে অস্ত্র বহনের বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, বিমানবন্দরে ব্যক্তির পরিচয় যাচাই, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। বিমানবন্দরের এয়ারসাইড, নিরাপত্তা সংরক্ষিত এলাকা ও নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অনুমোদন ছাড়া অস্ত্র, বিস্ফোরক বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। একইভাবে সরকারের অনুমতি ছাড়া দেশি বা বিদেশি কোনো বিমানে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে অস্ত্র বা গোলাবারুদ বহনের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে চলাচলকারী বিমান বা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানকারী বিমান বাংলাদেশের বিমান চলাচলসংক্রান্ত আইন মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত বিমানসমূহ যখন যেই স্থানে অবস্থান করবে, তখন সেই স্থানে বিদ্যমান এতদসংক্রান্ত আইন মেনে চলার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে।
