প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা ও বাগেরহাট সফরকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় মোংলা বন্দর এলাকায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা ও বাগেরহাট সফরকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় মোংলা বন্দর এলাকায়। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর ২০২৬) দিনব্যাপী সফরে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট এলাকা আকাশপথে পর্যবেক্ষণ, খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান এলাকা পরিদর্শন, মোংলা বন্দর এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে মোংলা বন্দরে হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। এ সময় বিভিন্ন স্লোগানে প্রকম্পিত হয় আশপাশের পরিবেশ।
সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরে আকাশপথে হিরণ পয়েন্ট ও সুন্দরবন এলাকা পর্যবেক্ষণ শেষে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন। এ সময় নলিয়ান বাজার মোড়ে অপেক্ষমাণ শত শত মানুষের সঙ্গে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় ও করমর্দন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই সেখানে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ খান, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন এবং জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
দুর্গম উপকূলীয় জনপদ দাকোপের নলিয়ানে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। কারও চোখে প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার আগ্রহ, কারও মনে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানোর প্রত্যাশা। নদীভাঙন, সুপেয় পানির সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত এ জনপদের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর সফরকে দেখছেন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে এলাকায় জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রীর অবতরণের স্থান নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ডগ স্কোয়াড দিয়েও তল্লাশি চালানো হয়। সফর উপলক্ষে নলিয়ান বাজারের পশ্চিম প্রান্তের পাকা সড়ক থেকে পূর্ব দিকে কোস্টগার্ড কার্যালয় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে ইট বিছিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পাশাপাশি নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রস্তুত করা হয় হেলিপ্যাড। সেখান থেকে নলিয়ানঘাট হয়ে নৌপথে বাগেরহাটের মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে মোংলা ও আশপাশের এলাকায় আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সংস্কার করা হয় ভাঙাচোরা সড়ক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় মোংলা বন্দরের জেটি, নৌযান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পাশাপাশি সফরের বিভিন্ন গন্তব্যে জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। এ সময় মোংলা পোর্ট পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মোংলা পৌর শাখার সভাপতি মো. জুলফিকার আলী এবং মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদারের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মোংলা বন্দর এলাকায় জড়ো হন। তাঁদের উপস্থিতিতে বন্দর এলাকায় ব্যাপক জনসমাগমের সৃষ্টি হয়। নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
দুপুরে মোংলার বানীশান্তা জেটি এলাকায় পৌঁছে নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ওয়ার্করুমের সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় যোগ দেন। এরপর মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শন করেন এবং বন্দরের কার্যক্রম ও অবকাঠামো ঘুরে দেখেন। বিকেলে বেজার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন শেষে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী, বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের আশা, মোংলা বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বেজার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাস্তবায়ন এবং উপকূলীয় এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।
মোংলা বন্দর দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিল্পায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর খুলনা ও বাগেরহাট সফরকে ঘিরে মোংলা ও উপকূলীয় অঞ্চলে উন্নয়ন নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উপকূলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে এ সফর কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
‘বাদাম বেচি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলাইছি, আর কি লাগে’ : ‘বাদাম বেচি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলাইছি, আর কি লাগে’ ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি কার সঙ্গে কথা কলাম, আমার জীবন সার্থক। বাদাম বেচি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলাইছি, আর কি লাগে।’ বৃহস্পতিবার খুলনা জেলার দাকোপের চালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হাত মেলানোর পর এভাবে অনুভূতি প্রকাশ করেন উচ্ছ্বসিত বাদাম বিক্রেতা রাজু। প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে হেলিকপ্টারে নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন। পরে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে নলিয়ান কোস্টগার্ডের পন্টুনে যান তিনি। সড়কের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নেতাকর্মীরা তাকে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী অনেকের সঙ্গে হাত মেলান। আবার অনেকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এর মধ্যে স্থানীয় বাদাম বিক্রেতা রাজুর সঙ্গেও হাত মেলান সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রীকে রাজু বলেন, অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আমার খুব ভালো লাগছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে খুলনা জেলার দাকোপ ও বাগেরহাট জেলার মোংলায় জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। মোংলা বন্দর থেকে দিগরাজ পর্যন্ত মহাসড়কে যান চলাচল সীমিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের সম্ভাব্য পথ ও পরিদর্শনস্থলগুলোতে সাদা পোশাকেও নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলেও আরোপ করা হয় বিধিনিষেধ।
