নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইউএজিএম বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার করে ৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। কারখানাটিতে উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পরও কাগজপত্রে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য দেখানোর অভিযোগ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরির তথ্য দেখানো হলেও বাস্তবে এসব কাঁচামাল স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে মামলা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদনটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এ পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব থেকে সন্দেহ
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজিমিজি দক্ষিণ পাড়ার বি/২৪০ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত ইউএজিএম বিডি লিমিটেডে অভিযান চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর আওতাধীন।
অভিযানকালে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে দেখেন। এতে উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়া যায়। ঘোষিত উৎপাদনের তুলনায় কারখানাটিতে বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল অনেক কম।
এ ছাড়া কারখানাটিতে বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসচালিত উৎপাদনব্যবস্থার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ঘোষিত পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
অভিযানের সময় উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কারখানার মেঝেতেও পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা এবং আমদানি করা কাঁচামাল কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়।
শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ
রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দিয়ে থাকে। এ সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুল্ক-কর ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করতে পারে। তবে এসব কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করার নিয়ম রয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইউএজিএম বিডি লিমিটেড বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) নিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির তথ্য দেখিয়েছে। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল অবৈধভাবে স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটি পিভিসি ফ্লেক্স, পিভিসি ফিল্ম, পেট ফিল্ম, কৃত্রিম চামড়া, ডুপ্লেক্স বোর্ড ও কালার বোর্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করত।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য দেখানো হলেও কারখানার বাস্তব উৎপাদন পরিস্থিতির সঙ্গে ঘোষিত তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে আমদানি করা কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার এবং রপ্তানি কার্যক্রমের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যেভাবে নির্ধারণ করা হয় রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ
অভিযানের পর কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির আমদানিসংক্রান্ত তথ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব, ইউটিলাইজেশন পারমিশন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া যায়।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে পাঠানো হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য বা মামলার পরবর্তী আইনগত অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে রাজস্ব ক্ষতির শঙ্কা
রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
একই সঙ্গে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। কারণ, শুল্ক-কর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করা ব্যবসায়ীদের তুলনায় সুবিধার অপব্যবহারকারীরা অন্যায্য ব্যয় সুবিধা পেতে পারে।
ইউএজিএম বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে আমদানি-রপ্তানির নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি কারখানার বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব পরীক্ষা করার গুরুত্ব সামনে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে আইনগত প্রক্রিয়ায়।
The post কারখানায় উৎপাদন নেই, কাগজে রপ্তানি: ৮৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি appeared first on SATV.
