Published on
:
2 min read
শাস্ত্রমতে আজ, বৃহস্পতিবার একাদশী। অর্থাৎ, মা দুর্গা বিদায় নিয়েছেন। তবে সামনের বছর আবার আসবেন। পঞ্জিকা মতে, গজে বা দোলায়। কিন্তু বৈদ্যবাটির শ্রীপর্ণা পোদ্দারের আর ঘরে ফেরা হলো না — জীবনের পঞ্জিকায় তাঁর বিদায়ের দিন লেখা হয়ে গিয়েছে আগেই। সেই সপ্তমীর সন্ধ্যায়।
চোরবাগানে দুগ্গাঠাকুর দেখতে যাওয়া মেয়ের যে নিথর দেহ ঘরে ফিরতে পারে, তা এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না মা স্বপ্নার। চোখের জল মুছতে মুছতেই অস্ফুট স্বরে প্রৌঢ়া বলছিলেন, ‘এ ভাবে এসো না আর। এ ভাবে নিয়ে চলে যেও না!’
ঘরে ঢোকার মুখেই রাখা মেয়ের ছবি। ক্ষণে ক্ষণে সেই ছবির সামনে গিয়ে বসছেন স্বপ্না। বার বার মেয়ের আঁকা ছবির বের করে দেখছেন। নিজে থেকেই বলছিলেন, ‘শ্রীপর্ণা বেনারসের সন্ধ্যা আরতির একটি ছবি আঁকছিল। বড় ক্যানভাসে আঁকা সেই ছবিটি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। হস্টেলে থাকার সময়ে একটু একটু করে ছবিটা আঁকত।’ ঠিক ছিল, আঁকা শেষ হলে ল্যামিনেট করিয়ে মাকে উপহার দেবেন শ্রীপর্ণা। ‘সারপ্রাইজ়’ দেবেন মাকে। কিন্তু সে আর হলো কই! প্রৌঢ়া বলেন, ‘ছবিটা এখনও হাতে পাইনি। আমরা মেয়ের হস্টেলে যাব। যদিও ওরা এখনও আমাকে ডেকে পাঠায়নি।’
বৈদ্যবাটির মালির বাগানের বাড়িটার এককোণে শুয়ে রয়েছে পোষ্যটাও। মেয়ে ছোট থাকতেই পপিকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন বাবা শম্ভুনাথ। তার পর থেকেই সে শ্রীপর্ণার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়াত। শ্রীপর্ণা অফিস থেকে ফিরলেই গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আদর করত। শ্রীপর্ণাও গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন। নিজের হাতে খেতে দিতেন। গত চার দিন ধরে সেই পপিও না খেয়ে রয়েছে। সে-ও কেমন যেন থম মেরে গিয়েছে! বাড়ির দরজার সামনে শুয়ে একটানা সে-ও বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
পেশায় নার্স শ্রীপর্ণা কাজ করতেন নিউ টাউনের টাটা ক্যান্সার হাসপাতালের রোবোটিক সার্জারি বিভাগে। স্বপ্নাও নার্স ছিলেন। বছর তিনেক আগেই তিনি অবসর নেন। বাবা শম্ভুনাথের কাপড়ের ব্যবসা। স্বপ্না জানান, সপ্তমীর সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টা নাগাদ চোরবাগানের মণ্ডপের লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষবারের মতো ফোন করেছিলেন শ্রীপর্ণা। বলেছিলেন, ট্রেনে উঠে জানাবেন। মা-ও জানিয়েছিলেন, বাবা তাঁকে স্টেশনে আনতে যাবেন। তার কিছু ক্ষণ পরেই বাড়িতে ফোন আসে। জানানো হয়, শ্রীপর্ণা আর নেই। এর পর থেকেই কার্যত থমকে গিয়েছে স্বপ্নার জীবন।
শাড়ি এবং ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে ভালোবাসতেন শ্রীপর্ণা। এ বার পুজোয় ছ’টা নতুন জামাও কিনেছিলেন। মা-মেয়ে একসঙ্গেই কেনাকাটা করতেন। কখনও কখনও একা শপিং-এ গেলে মাকে জামাকাপড়ের ছবি তুলে পাঠাতেন হোয়াটসঅ্যাপে। কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বপ্না। ধরা গলায় কোনও রকমে বলেন, ‘এখন আর কেউ নেই। একজনই ছিল, যে আমাকে সব কিছুতেই সাহায্য করত। এখন আর কেউ বলার নেই, মা তুমি কী খেয়েছো, কী নেবে, কোনটা তোমার পছন্দ। সব কিছুতেই ও আমার পাশে থাকত। ঠাকুরের কাছে একটাই প্রার্থনা, এত মানুষের কোল খালি হয়ে যাওয়াটা যেন আর কখনও না হয়। আমার যা যাওয়ার, তা তো গিয়েইছে।’
