সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আইনের প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেন মানবজমিন সম্পাদক। তবে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনা হবেই, গণতান্ত্রিক সমাজে তা হতেই পারে। এই দুটিকে আলাদা করা না গেলে বিপদ থেকেই যাবে।
সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সরকার সমালোচনার বিরুদ্ধে কঠোর আইন করতে চায়, কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর তারাই এসব অন্যায়ের শিকার হয়।
এ সময় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দয়া করে আইনের নামে আমাদের হাত আর বাঁধবেন না। আমাদের হাত বেঁধে দিলে দিনশেষে আপনাদেরই ক্ষতি হবে, কারণ আপনাদের পক্ষেও তখন আর কেউ লিখতে পারবে না।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন’ নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রস্তাবিত আইনে ‘ভুল তথ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে- প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কোনো সংবাদ কারো পছন্দ না হলেই সেটিকে ভুল তথ্য বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত সংবাদ বলে দাবি করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনটি ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য, তা কে নির্ধারণ করবেন, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা দেয়ার বিষয়টির বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়—সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এইটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?
সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আইনের প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেন মানবজমিন সম্পাদক। তবে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনা হবেই, গণতান্ত্রিক সমাজে তা হতেই পারে। এই দুটিকে আলাদা করা না গেলে বিপদ থেকেই যাবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান বিতর্কিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে তা স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে এবং দিনশেষে এটি সরকারের জন্যই বুমেরাং ও আত্মঘাতী হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাক-স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অধিকার ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণকে একই আইনের আওতায় আনলে রাষ্ট্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি আরো বলেন, মেটার (ফেসবুক) মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোর মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করে অপতথ্য বা সাইবার অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয়। অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে এসব প্ল্যাটফর্মের আর্থিক মুনাফা বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্বে যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সে অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি আরো বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম একই পথের যাত্রী। তাই তাদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি। প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি ।
আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অতীতে নানা সংঘাত তৈরি হয়েছে। ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যা এবং সম্প্রতি সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার মতো সহিংসতায় ফেসবুকের অপব্যবহার দেখা গেছে। তবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এসব প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
শফিকুল আলম যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনে পরামর্শ দেন, মানহানিকে কোনো ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে না রেখে দেওয়ানি আইনের অধীনে আনা উচিত। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে সম্মানহানির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা প্রয়োজন, যাতে বিদেশে বড় পত্রিকাগুলোর মতো ক্ষতিপূরণের বাজেট রাখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
এ সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি মূলত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে হয়। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের হাত-পা বেঁধে দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের জন্য পুরো মিডিয়া হাউস বন্ধ করে দেয়ার মতো বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার অবাধ ক্ষমতা পেয়েছেন, যা একটি পুরো সংবাদ সংস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এছাড়া আইনে ‘মানহানি’র সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞাও নেই। তাই তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে আইন প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
