দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে লিভার রোগ। প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। বিভিন্ন ধরনের লিভার রোগে ভুগছেন প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। অথচ দেশে হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১৪০ জন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না হলে ভবিষ্যতে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়বে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিএমসি লিভার ফেস্ট ২০২৬’-এ বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন। কলেজের শহীদ ডা. সামসুল আলম খান মিলন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে লিভার রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক সেশনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের লিভার রোগের চিকিৎসা ও সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। কিন্তু সে তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অপ্রতুল।
তিনি বলেন, আগে দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল হেপাটাইটিস বি ও সি। বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ বাড়ছে।
ঢামেকের হেপাটোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. জান্নাতুল হাবিবা নীলা বলেন, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রতি চারজনের একজনের ওজন স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তাই শুধু ওজন দেখে লিভারের সুস্থতা নিশ্চিত হওয়া যায় না। দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৬৮.৮ শতাংশের ফ্যাটি লিভার রয়েছে। এ রোগ প্রতিরোধে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ফাস্টফুড ও জাঙ্কফুড খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কম করা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন লিভার রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, লিভার রোগের চিকিৎসায় দেশে অগ্রগতি হয়েছে। তবে গবেষণা ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে একটি পূর্ণাঙ্গ লিভার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ঢামেক হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম শাকিল গনি বলেন, মাত্র চারটি কক্ষে সীমিত জনবল নিয়ে বিভাগটি বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিচ্ছে। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণে আরও জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংক্রমণ কমেছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত দেশে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এ কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে লিভার প্রতিস্থাপন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার সহযোগিতা করবে।