ইসরায়েলি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি এবং তাদের যন্ত্রে আড়িপাতার সফটওয়্যার প্রবেশ করাতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পৃথক দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কানাডাভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়েন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুসহ একাধিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান গুগল, কমকাস্ট, রাশিয়ার ইয়ানডেক্সসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ ২০২১ সালে ক্যান্ডিরুকে কালো তালিকাভুক্ত করে। সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের লক্ষ্য করে ক্ষতিকরভাবে ব্যবহৃত স্পাইওয়্যার সরবরাহের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হওয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থা এখন বড় পরিসরে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক উলফি ক্রিস্টল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘বর্তমানে যেভাবে অনলাইন বিজ্ঞাপন কাজ করে, তা একটি পদ্ধতিগত নিরাপত্তাঝুঁকি।’ তার মতে, রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজসহ সবার জন্যই এ ঝুঁকি প্রযোজ্য।
সিটিজেন ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিসকভার-টেক বিভিন্ন অংশীদারের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার অ্যাপে বিজ্ঞাপন প্রচার করত। এসব বিজ্ঞাপনের অনেকগুলোই ছিল মোবাইল ফোন বা ইয়ারবাডের মতো সাধারণ পণ্যের।
গবেষকদের দাবি, ব্যবহারকারীরা এসব বিজ্ঞাপনযুক্ত ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে বা অ্যাপ ব্যবহার করলে তাঁদের শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব হতো। কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টাও করা হয়েছে। নজরদারির জন্য ব্যবহারকারীর শুধু সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনটি লোড হওয়াই যথেষ্ট ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি গবেষণা সংস্থাই জানিয়েছে, কিছু বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীর যন্ত্রে ক্যান্ডিরুর স্পাইওয়্যার স্থাপনে সহায়তা করেছিল। তবে কনফিয়েন্টের দাবি, ক্যান্ডিরুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলো ডিসকভার-টেকের মোট বিজ্ঞাপনের তুলনায় খুবই সামান্য অংশ ছিল।
কনফিয়েন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেরোম ডাঙ্গুর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন অন্তত এক কোটি বিজ্ঞাপন প্রচার করত। কুকি ম্যাচিং নামে পরিচিত তথ্য বিনিময়ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের সরাসরি আওতার বাইরেও ব্যবহারকারীদের অনুসরণ করা সম্ভব হতো।
ডাঙ্গু বলেন, ‘খুব সম্ভবত কয়েক শ কোটি মানুষ ডিসকভার-টেকের কার্যক্রমের আওতায় এসেছেন।’
সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার ৪৫টি উইন্ডোজচালিত কম্পিউটারে ক্যান্ডিরুর শক্তিশালী স্পাইওয়্যার প্রবেশ করানো হয়েছিল। ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই স্পাইওয়্যার ছড়ানো হয়েছিল বলে গবেষকদের দাবি।
আল-জাজিরা নিজেদের নেটওয়ার্কের লগ বা কার্যক্রমের রেকর্ড গবেষণা সংস্থাটির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটিজেন ল্যাব।
এক বিবৃতিতে আল-জাজিরা বলেছে, তাদের কয়েকজন কর্মীকে লক্ষ্য করে চালানো স্পাইওয়্যার হামলার নিন্দা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। কর্মী ও প্রযুক্তিব্যবস্থার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা। হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
কনফিয়েন্টের ডাঙ্গু আরও বলেন, পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কেও এসব ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল। ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোতে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি বিশেষভাবে বেশি ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ফিলিস্তিনের প্রায় যেকোনো ওয়েবসাইটে গেলেই ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। এর ফলে পুরো একটি দেশের মানুষের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং এক ডজনেরও বেশি দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কেও এসব বিজ্ঞাপন দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এনভিডিয়া, স্যানডিস্ক, ব্রডকম ও মাইক্রনের মতো চিপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং মেক্সিকো, ইসরায়েল ও ইউরোপের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের নেটওয়ার্কেও বিজ্ঞাপনগুলো দেখা গিয়েছিল।
গবেষকদের অনুসন্ধানে ডিসকভার-টেকের পরিচয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্য উঠে এসেছে। সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অসাবধানতাবশত নিজেদের পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত লগ ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করে রেখেছিল। সেখান থেকে ইসরায়েল, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট ঠিকানা ব্যবহার করে লগইন করার তথ্য পাওয়া যায়।
এদিকে অভিযোগ প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অনলাইন বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে বাদ পড়ছে।
গুগল জানিয়েছে, সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়েন্টের তদন্তে তারা সহযোগিতা করেছে এবং নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘনের কারণে ডিসকভার-টেককে নিজেদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
ইউরোপের ডিজিটাল বিপণন ও বিজ্ঞাপন খাতের সংগঠন আইএবি ইউরোপ জানিয়েছে, নিরীক্ষায় নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের অনুমোদিত বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের তালিকা থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। কমকাস্টের বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিসওয়াক্সও সাম্প্রতিক কার্যক্রমের পর ডিসকভার-টেককে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে ইয়ানডেক্স সাড়া দেয়নি।
ডিসকভার-টেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও রয়টার্স কোনো জবাব পায়নি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ডেকেল বোনির কাছেও পাঠানো ইমেইল ও লিংকডইন বার্তার উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপনভিত্তিক নজরদারিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে পেন্টাগন জানিয়েছিল, বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তথ্য-ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার খবর পাওয়া গেছে। এর পর সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা কিছু যন্ত্রে বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং বন্ধ করেছে।
