ঠাকুর দেখে ভিড়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে বাড়ি ফিরতেই শুরু জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা। অনেকেই ভাবেন, ক্লান্তি বা আবহাওয়া বদলের কারণেই হয়তো শরীর খারাপ। কিন্তু উপসর্গের পিছনে থাকতে পারে শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসঘটিত সংক্রমণও।
সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা, এমনকী কোভিড, একাধিক সংক্রমণের উপসর্গের মধ্যে মিল রয়েছে। আবার জ্বরের কারণ সব সময় শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ নয়। তাই কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন, আর কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, তা জেনে রাখা প্রয়োজন।
ভিড় থেকে সংক্রমণ?
দুর্গাপুজোর সময়ে জনবহুল প্যান্ডেল, বাস, ট্রেন, রেস্তরাঁয় দীর্ঘক্ষণ কাটানোর ফলে সংক্রমিত মানুষের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বাড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময় নির্গত সংক্রামক কণার মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্রের একাধিক ভাইরাস ছড়াতে পারে।
সেই কারণেই ভিড় থেকে ফেরার পর কারও কারও সর্দি-কাশি বা জ্বর দেখা দিতে পারে। তবে ভিড় থেকে ফিরেই অসুস্থ হয়েছেন মানেই যে ভিড় থেকেই সংক্রমণ হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সাধারণ সর্দির ক্ষেত্রে নাক দিয়ে জল পড়া, হাঁচি, গলাব্যথা ও হালকা কাশি দেখা যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জায় অনেক সময় আচমকা জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং প্রবল ক্লান্তি দেখা দেয়। কোভিডের উপসর্গও জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শরীরব্যথার মতো হতে পারে। ফলে শুধু উপসর্গ দেখে কোন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা সব সময় সম্ভব নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করতে হতে পারে।
জ্বর মানেই কি ভাইরাল?
জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকলে ভাইরাসঘটিত সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। তবে সব জ্বরকেই সাধারণ ভাইরাল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গির মতো মশাবাহিত অসুখেও জ্বর হতে পারে। বিশেষ করে তীব্র শরীরব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, বমি বা পেটে ব্যথার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গির ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরেও কিছু বিপদের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
আবার জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। উপসর্গের ধরন, কত দিন ধরে জ্বর রয়েছে, রোগীর বয়স এবং অন্য কোনও অসুখ আছে কি না, সব কিছু বিবেচনা করেই চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেন।

বাড়িতে কী করবেন?
জ্বর-সর্দি শুরু হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং জল ও অন্যান্য তরল পান করুন। শরীরে জলের ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত তরল পান জরুরি। জ্বর থাকলে তাপমাত্রা মাপুন এবং উপসর্গের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখুন। অসুস্থ অবস্থায় প্যান্ডেল হপিং বা ভিড়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে মাস্ক ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। সাধারণ সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিডের মতো ভাইরাসঘটিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। জ্বর কমানোর ওষুধের প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডেঙ্গির সম্ভাবনা থাকলে নিজের মতো করে ব্যথা বা জ্বরের ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ বেছে নেওয়া জরুরি।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
জ্বর চার দিন বা তার বেশি স্থায়ী হলে, দশ দিনেও সর্দি-কাশির উপসর্গ না কমলে বা প্রথমে ভালো হয়ে আবার জ্বর বা কাশি বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে এত দিন অপেক্ষা করা উচিত নয়। শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা ব্যথা, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা গুরুতর দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা, বাচ্চা এবং ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী অসুখ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার মতো সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। এঁদের জ্বর-সর্দি শুরু হলে উপসর্গ বাড়ার অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
পুজোর আনন্দের পর শরীর খারাপ হলে তাকে শুধু ক্লান্তির ফল ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। আবার প্রতিটি জ্বরেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত জলপান, সংক্রমণ প্রতিরোধের অভ্যাস এবং শরীরের লক্ষণ বুঝে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই অসুস্থতা সামলানোর সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
