মরুর আকাশে সূর্য প্রতিদিনের মতোই ওঠে। রিয়াদের ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলে গাড়ি, দোকানপাটে জমে মানুষের ভিড়, নির্মাণস্থলে হাতুড়ির শব্দে এগিয়ে চলে কাজ। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। অথচ এই স্বাভাবিকতার আড়ালে কোথাও জমে থাকে অজানা আশঙ্কা, বুকের ভেতর নীরব কাঁপনÑ যুদ্ধের খবর, আকাশপথের অনিশ্চয়তা আর দূর দেশে পড়ে থাকা পরিবারের জন্য একরাশ দুশ্চিন্তা। এই মরুর দেশেই জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলাদেশের লাখো মানুষ। কেউ এসেছেন ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে, কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, কেউবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। তাদের কাছে সৌদি আরব শুধু একটি দেশ নয়; এটি ঘাম, শ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্নের আরেক নাম। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লে সেই স্বপ্নের আকাশেও দেখা দেয় অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। দিনের কাজ শেষে ছোট্ট কক্ষে ফিরে ফোনের পর্দায় চোখ রাখেন প্রবাসীরা। দেশে থাকা মা ফোন করে জানতে চান, ‘বাবা, তোমরা ভালো আছ তো?’ স্ত্রী জানতে চান, বাইরে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। সন্তান হয়তো বুঝতেই পারে না যুদ্ধ কী, কিন্তু বাবার কণ্ঠে উদ্বেগের আভাস ঠিকই টের পায়।
কেউ খবরের শিরোনাম পড়েন, কেউ পরিচিতজনের কাছ থেকে পরিস্থিতির খোঁজ নেন। আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কোনটি সত্য, কোনটি গুজবÑ তা বুঝে ওঠাও কখনো কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতা হলো, বিপদের সময় নিজের উদ্বেগের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে পরিবারের চিন্তা। দেশে থাকা মানুষগুলো অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের, একটি আশ্বাসেরÑ‘আমি ভালো আছি, চিন্তা করো না।’
বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ঘাম মিশে আছে সৌদি আরবের নির্মাণকাজে, পরিচ্ছন্নতায়, পরিবহনব্যবস্থায়, দোকানপাটে ও নানা পেশায়। দিনের পর দিন পরিশ্রম করে তারা দেশে পাঠান কষ্টার্জিত অর্থ। সেই অর্থে চলে পরিবারের সংসার, মেটে সন্তানের পড়াশোনার খরচ, শোধ হয় ঋণ, কখনো গড়ে ওঠে ছোট্ট একটি বাড়ি।
তাই যুদ্ধের আশঙ্কা তাদের কাছে কেবল সংবাদমাধ্যমের একটি শিরোনাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চাকরি, আয়, বাসস্থান এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ। তবু এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না। কাজের প্রয়োজনে বাইরে যেতে হয়, বাজার করতে হয়, পরিবারের খোঁজ রাখতে হয়। আর এসবের মাঝেই শিখতে হয় সতর্ক থাকার নতুন পাঠÑকীভাবে বিপদ এড়িয়ে চলতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যুদ্ধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির সময়ে সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলোÑ আতঙ্কের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি খবর বিশ্বাস করা, যাচাই না করে ভিডিও শেয়ার করা কিংবা গুজব শুনে হঠাৎ কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে পড়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ সময় সৌদি আরবের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমিয়ে আনা, সতর্কতা জারি করা এলাকা এড়িয়ে চলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। বিস্ফোরণ বা হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে জানালা ও কাচের দরজা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে থাকলে নিরাপদ ও মজবুত আশ্রয় খুঁজতে হবে। সন্দেহজনক বস্তু কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখলে কাছে যাওয়া যাবে না। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। পাসপোর্ট, ইকামা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, কিছু পানীয় জল, চার্জ দেওয়া মোবাইল ফোন এবং জরুরি যোগাযোগের নম্বর হাতের কাছে রাখা ছোট প্রস্তুতি হলেও বিপদের সময়ে তা বড় কাজে আসতে পারে।
বিদেশের মাটিতে বিপদের মুখে পড়লে একজন প্রবাসীর কাছে নির্ভরযোগ্য সহায়তার পথ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি নিয়মিত অনুসরণ করা উচিত। প্রয়োজনে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা চাইতে হবে। একই সঙ্গে কর্মস্থলের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার। বিশেষ করে যারা একা থাকেন, ভাষাগত সমস্যায় পড়েন কিংবা জরুরি নির্দেশনা বুঝতে অসুবিধা হয়, তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রবাসীদের পারস্পরিক দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় যোগাযোগের নম্বর কেবল মোবাইলে নয়, কাগজেও লিখে রাখা ভালো। নেটওয়ার্কে সমস্যা হলে কিংবা ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে সেই কাগজই হয়ে উঠতে পারে যোগাযোগের বিকল্প ভরসা। সংঘাতের সময় একটি মিথ্যা খবরও হাজারো মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার নামে প্রচারিত হতে পারে, আবার অনুমাননির্ভর বার্তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে এক শহর থেকে অন্য শহরে।
তাই কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা জরুরি। সংঘাত-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও বা স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় আইন ও সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা প্রত্যেক প্রবাসীর দায়িত্ব।
কারণ, এই সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য নয়; আশপাশের মানুষের মনেও অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সাহায্য করে। প্রবাসের জীবনে সহকর্মী অনেক সময় হয়ে ওঠেন পরিবারের সদস্যের মতো। একই কক্ষে থাকা মানুষটি হয়তো ভিন্ন জেলার, ভিন্ন গ্রামের; কিন্তু বিপদের সময় তার হাতটিই হতে পারে সবচেয়ে কাছের আশ্রয়। কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ এগিয়ে দেওয়া, কারও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না হলে খোঁজ নেওয়া, জরুরি নির্দেশনা বুঝতে না পারলে অনুবাদ করে দেওয়াÑ এমন ছোট ছোট কাজেই গড়ে ওঠে প্রবাসীদের পারস্পরিক নিরাপত্তার বলয়। তবে সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে এবং নিরাপদ অবস্থান থেকে সহায়তা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রবাসীর কাছে ‘বাড়ি’ শব্দটির অর্থ অন্য রকম। সেখানে অপেক্ষা করেন মা, স্ত্রী, সন্তান কিংবা বৃদ্ধ বাবা। ঈদের সময় বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি থাকে, থাকে ছুটিতে দেশে গিয়ে সন্তানের হাত ধরে হাঁটার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়েই তারা পাড়ি দেন হাজার মাইল।
যুদ্ধের অনিশ্চয়তা তাদের মনে প্রশ্ন জাগাতে পারেÑ আগামীকাল কেমন হবে? কাজের পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে তো? পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে তো? দেশে ফেরার প্রয়োজন হলে নিরাপদ পথ পাওয়া যাবে তো? এসব প্রশ্নের সব উত্তর এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতি বদলাতে পারে, সরকারি নির্দেশনাও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিমান চলাচলের অবস্থা, ভ্রমণপথ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ যাচাই করা প্রয়োজন। সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিরা কেবল প্রবাসী শ্রমিক নন; তারা বহু পরিবারের ভরসা, অসংখ্য স্বপ্নের কারিগর। তাদের নিরাপত্তা মানে বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের স্বস্তি। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ভয় যেন ভুল সিদ্ধান্তের কারণ না হয়। সচেতনতা, প্রস্তুতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই হতে পারে এই কঠিন সময়ে পথ চলার শক্তি। মরুর বুকে দিন শেষে যখন রাত নামে, তখন হয়তো দূর দেশের কোনো ছোট্ট কক্ষে বসে একজন বাংলাদেশি আবার ফোন করেন নিজের বাড়িতে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে মায়ের কণ্ঠ, সন্তানের হাসি কিংবা প্রিয় মানুষের আশ্বাস। সেই কণ্ঠেই তিনি খুঁজে পান বেঁচে থাকার সাহস। আর মনে মনে প্রার্থনা করেনÑ আকাশ আবার শান্ত হোক, অনিশ্চয়তা কেটে যাক, একদিন নিরাপদে ফিরতে পারেন প্রিয়জনদের কাছে।
কারণ, প্রবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু অর্থ উপার্জন নয়Ñ সুস্থ শরীরে, নিরাপদে, একদিন আপন ঠিকানায় ফিরে আসা।
