বাগেরহাটে মধ্যরাতে হাসপাতালে দায়িত্বরত এক নারী চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার দিনগত রাত ১২টার দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক সাকিয়া হক হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার। অসুস্থ হওয়া শ্রমিক দল নেতাকে ক্যানুলা পরানোকে কেন্দ্র করে তাঁর লোকজন ওই নারী চিকিৎসকে তাঁর কক্ষে ঢুকে গালাগাল ও মারধর করতে তেড়ে আসেন বলে তাঁর অভিযোগ।
ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে গতকাল রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন সাকিয়া হক। সেখানে তিনি লেখেন, ‘বাগেরহাটে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শানু (নাকি হারুন জানি না) এসে শুধু গায়ে হাত দেওয়া বাকি রাখছে নাইট ডিউটিতে। আমি একা রুমে। ৮-১০ জন সাঙ্গোপাঙ্গ এসে মারমুখো। কারণ একটাই—আমাদের ওয়ার্ড বয় ক্যানুলা মিস করছে।’
হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী, ওই রোগীর নাম শানু। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁর পুরো নাম আবু হানিফ (শানু)।
বাগেরহাট পৌর শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম ভূঁইয়া ওরফে সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে বাগেরহাটে শ্রমিক দলের কোনো কমিটি নেই। আবু হানিফ শ্রমিক দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আবু হানিফের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
শ্রমিক দল নেতা সেলিম ভূঁইয়া মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাপারটা আসলে তো যেভাবে ফলাও হইছে, ও রকম না। ও তো দলীয়ভাবে যায়নি। একটা নার্স ৬ জায়গা ফুটো করেছে। তখন গিয়ে বলে, ম্যাডাম আমার তো কষ্ট হচ্ছে। আপনি একটু প্লিজ এটে (ক্যানুলা) করে দেন। উনি (ডাক্তার) আবার বলছে, এটা আমার কাজ না। উনিও ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলেছে। এ জন্য এট্টু বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে।’
এ সম্পর্কে সোমবার দুপুরে সাকিয়া হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল রোববার বেলা আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আমার ডিউটি ছিল। ওই সময়ে হাসপাতালটিতে আমিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম। রাত ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যথা নিয়ে একজন রোগী হাসপাতালে আসেন। প্রথমে তাঁর ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হয়। পরীক্ষা ও রক্তচাপসহ অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদ্যন্ত্রের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে গ্যাসের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেন।’
সাকিয়া হক আরও বলেন, ‘ইনজেকশন দেওয়ার জন্য রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরাতে গিয়ে প্রথমবার ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসক। দ্বিতীয়বারও একজন ওয়ার্ড বয় চেষ্টা করেন। এতে রোগীর স্বজনেরা মারমুখী হয়ে ওঠেন। দায়িত্বরত ব্যক্তিরা শিশু বিভাগের নার্সদের ডাকতে যান। কারণ, তাঁরা বেশ অভিজ্ঞ ক্যানুলা পরানোর বিষয়ে। এর মধে৵ই রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল শুরু করেন এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন।
সাকিয়া হক অভিযোগ করেন, ‘রোগীর সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গ (লোকজন) বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁরা আমার কক্ষে ঢুকে গালাগাল করেন। বারবার তেড়ে আসেন। তাঁরা গায়ে হাত দেননি, দিতে পারেননি। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে তাঁরা গায়ে হাত দিতেন কি না, তা বলা কঠিন। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীর স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। কোনো হাসপাতালেই এই পরিবেশ মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালে পাঁচ শর ওপরে রোগী ভর্তি; কিন্তু কর্মী আছেন পদের তিন ভাগের এক ভাগ। তাঁর মধে৵ও সবাই সেবা দিতে চেষ্টা করছেন। এমন ঘটনা দুঃখজনক।
দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায়নি। অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির আগামী সভায় বিষয়টি জানানো হবে।
