মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আগের দিন সোমবার ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। এর পর রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করেন। ফলে সেদিন থেকেই তার পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে।
গত সোমবার দুপুরে কয়েকশ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে ‘বিব্রত না হয়’ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ ‘আড়ালে পড়ে না যায়’, সে জন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর আগে শনিবার বিকালে নিজের ফেসবুক পেজে গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন। ওই ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে— একজন জনপ্রতিনিধি এভাবে অস্ত্র হাতে
অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কিনা।
অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এখন ঢাকার রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো— ইশরাক হোসেন কি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? যদিও এ বিষয়ে নিজের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেছেন ইশরাক হোসেন। এ ছাড়া মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাক হোসেনের বিদায়ে তার অনুসারীদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার রাজপথ— সবখানেই এখন ইশরাক অনুসারীদের সরব উপস্থিতি। ইশরাক হোসেনের কট্টর অনুসারী ও যুবদল-ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করতে তিনি (ইশরাক হোসেন) যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেটিকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ভিন্ন খাতে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া ফেসবুকে অনেক সমর্থক তাকে ‘সাহসী ও ত্যাগী নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন এবং লিখছেন, ‘আমরা এমন নেতাই চাই যে নিজের হাতে জনগণের সমস্যা সমাধান করতে ভয় পায় না।’
অনুসারীদের দাবি, ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ইশরাককে হারানো হয়েছিল, যা পরে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে তাকে বৈধ মেয়র ঘোষণা করেছিল। তাই সমর্থকরা এখন বলছেন; ‘মন্ত্রী পদ গেছে তো কী হয়েছে, আমরা ইশরাক ভাইকে দক্ষিণের মেয়র হিসেবে দেখতে চাই।’
তবে ইশরাক হোসেন পদত্যাগের পরপরই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আগামী ডিএসসিসি নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদিও প্রতিমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করার সংবাদ সম্মেলনেও সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে কাজ করে আসছি। দলের স্বার্থে যদি হাইকমান্ড মনে করে আমার সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রয়োজন, তবে আমি শতভাগ প্রস্তুত। আর দল যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়, তবে তাকে বিজয়ী করার জন্যও আমি সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে থাকব।
ইশরাক হোসেনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সহযোগীদের একজন আমাদের সময়কে বলেন, ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করার পরপরই সোমবার তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ (সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালির আংশিক) এবং পুরান ঢাকার স্থানীয় কর্মী-সমর্থক ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করেছেন। পরে সন্ধ্যায় তিনি পুরান ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শনে বের হন। এর পর পুরান ঢাকার গোপীবাগে তার পৈতৃক বাসভবনে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা এসে জড়ো হলে যেখানে তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন ইশরাক হোসেন। নিজের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে ইশরাক হোসেন স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি কোনো মন্ত্রিত্ব বা পদের মোহে রাজনীতি করেন না; বরং তার মূল লক্ষ্য তার প্রয়াত পিতা, ঢাকার সাবেক সফল মেয়র সাদেক হোসেন খোকার মতো সাধারণ মানুষের পাশে থাকা। গতকাল মঙ্গলবারও একইভাবে সময় অতিবাহিত করেন ইশরাক হোসেন। কর্মসূচির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর থেকে তিনি যেন আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
ইশরাক হোসেনের পারিবারিক সূত্র বলছে, ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মূল লক্ষ্য এখন ডিএসসিসির মেয়র পদ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতির চেয়ে তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং এর সামগ্রিক প্রস্তুতির দিকেই বেশি মনোযোগী। যেহেতু ইশরাক হোসেন নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে, দল ও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইলে তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করতে শতভাগ প্রস্তুত আছেন। যেহেতু ইশরাক হোসেনের পিতা প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ডিএসসিসির সাবেক সফল মেয়র। পুরান ঢাকাসহ পুরো দক্ষিণে খোকার যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল, ইশরাক তার উত্তরাধিকার ধরে রেখে মেয়র পদের মাধ্যমেই ঢাকার মানুষের সেবা করতে চান। এ ছাড়া তিনি ২০২০ সালের বিতর্কিত ডিএসসিসি নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। পরে ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল সেই ফলাফল বাতিল করে তাকে বৈধ মেয়র হিসেবে ঘোষণাও করেছিল, যদিও আইনি জটিলতায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। ফলে দক্ষিণ সিটির মেয়রের আসনের প্রতি তার একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অধিকার ও দাবি রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে কিছুদিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। সম্প্রতি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের পর তিনি তার পুরো শক্তি ও নজর এখন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দিকে দিতে চাচ্ছেন। যদিও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপিতে তার একটি বড় বলয় এবং শক্তিশালী অনুসারী দল রয়েছে, তবে দলীয় কোনো সাংগঠনিক পদ আঁকড়ে ধরার চেয়ে ঢাকার ‘নগরপিতা’ হওয়ার দৌড়েই এগিয়ে থাকতে চাচ্ছেন ইশরাক হোসেন।
বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্রমতে, ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে যে কয়েকটি বিষয় জড়িত তার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই হতে পারে তাকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ফ্রি করে দেওয়া, যাতে তিনি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেন। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পক্ষ থেকে আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ মুখকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তাই বিএনপিও চাইবে পুরান ঢাকায় জনপ্রিয় সাদেক হোসেন খোকার উত্তরাধিকারী ইশরাককে দিয়ে মাঠ নিজেদের দখলে রাখতে। তা ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানোর পর ইশরাক হোসেনের জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক শক্তি কমেনি; বরং তার অনুসারীদের সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে তিনি আগামী সিটি নির্বাচনে একজন হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত যদি ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালামকেই সিটি মেয়র হিসেবে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়, সেক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির শীর্ষ দুই পদের একটিতে দেখা যেতে পারে ইশরাক হোসেনকে।
