অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছেন কিংবা কোর্স শেষ করতে ১২ মাসের বেশি অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন—এমন শিক্ষার্থীদের নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে হবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে। শুধু আবেদন করার সময় নয়, নতুন ভিসা মঞ্জুরের সময়ও থাকতে হবে দেশের বাইরে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার বাহির থেকে আবেদন করলেও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘নতুন শিক্ষার্থী ভিসাসংক্রান্ত নির্দেশিকা’ শিরোনামে প্রকাশিত এক পোস্টে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভিসার আবেদন ও ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বায়োমেট্রিক দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হালনাগাদ নির্দেশনা অনুযায়ী, ২ অক্টোবর ২০২৬ থেকে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদনসংক্রান্ত নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে পরবর্তী স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির শিক্ষার্থী শর্তসাপেক্ষে ছাড় পেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার সময় এবং নতুন ভিসা মঞ্জুরের সময়—দুই ক্ষেত্রেই আবেদনকারীকে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থাকতে হবে। তবে এই নিয়মের অর্থ এই নয় যে শিক্ষার্থীরা আর অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে পারবেন না। তাঁরা নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে পারবেন। ভিসা মঞ্জুর হলে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ থাকবে।
১২ মাসের ছাড় পাবেন কারা
মূল কোর্স শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট শর্তে অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল কোর্সের নির্ধারিত সমাপ্তির তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ১২ মাস অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে।
প্যাকেজভুক্ত কোর্সের ক্ষেত্রে যে কোর্স শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন, সেটি মূল কোর্স হতে হবে। কোর্স পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তরসংক্রান্ত শর্তও পূরণ করতে হবে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তর বা প্রতিরক্ষা দপ্তরের স্পনসরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, পিএইচডিতে ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার কোর্সে অগ্রসর হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্যও ব্যতিক্রম রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোর্স চালিয়ে যেতে না পারা কিছু শিক্ষার্থীও ছাড় পেতে পারেন। তবে কোনো একটি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাড় পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার আগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
নতুন নির্দেশনায় ভিসার আবেদন ও ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের প্রথমেই বর্তমান ভিসার মেয়াদ যাচাই করতে হবে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোর্সের অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং হালনাগাদ কনফার্মেশন অব এনরোলমেন্ট সংগ্রহ করতে হবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী আঙুলের ছাপ ও ছবি দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার বাহিরে অবস্থান করে আবেদন জমা দেওয়ার পর ইমিগ্রেশন অ্যাকাউন্ট নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত তথ্য চাইলে দ্রুত তা সরবরাহ করতে হবে।
ভিসার সিদ্ধান্তের আগে ফিরলে জটিলতা
বাইরে থেকে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন জমা দিলে সেই আবেদনের ভিত্তিতে ব্রিজিং ভিসা দেওয়া হয় না। ফলে নতুন ভিসার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে চাইলে শিক্ষার্থীকে অন্য কোনো বৈধ ভিসার অধিকারী হতে হবে এবং সেই ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আবেদনকারী বৈধ অন্য কোনো ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারলেও নতুন স্টুডেন্ট ভিসা মঞ্জুরের সময় তাকে দেশের বাইরে যেতে বলা হতে পারে। তাই নতুন ভিসা মঞ্জুর না হওয়া পর্যন্ত ফেরার বিমান টিকিট বা আবাসনের ব্যবস্থা চূড়ান্ত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পড়াশোনার প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ায় উপস্থিত থাকা প্রয়োজন হলে সীমিত পরিস্থিতিতে ভিজিটর ভিসা একটি বিকল্প হতে পারে। তবে এ ধরনের ভিসারও নিজস্ব শর্ত রয়েছে এবং এটি ভবিষ্যতে অন্য ভিসার যোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ
নতুন নিয়মে দেশের বাইরে থেকে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের একই আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের আওতায় না পড়লে নতুন আবেদনে স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল সন্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
বর্তমান ভিসায় পরিবারের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে তাঁদের যোগ্যতা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। তাই শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন ও ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে প্রযোজ্য নিয়মও দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কিছু আবেদন পাবে অগ্রাধিকার
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কিছু শিক্ষার্থীর দেশের বাইরে থেকে করা সম্পূর্ণ ভিসার আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেন এমন শিক্ষার্থী, যাঁদের কোর্স শেষ করতে বাধ্যতামূলক পেশাগত বা ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং সেই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হয়েছে। একইভাবে, মূল প্রতিষ্ঠানে সন্তোষজনক অগ্রগতি বজায় রেখে একই স্তরের অনুরূপ কোর্সের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হওয়া কিছু শিক্ষার্থীর আবেদনও অগ্রাধিকার পেতে পারে।
তবে অগ্রাধিকার পাওয়া মানেই ভিসা মঞ্জুর হওয়া নয়। প্রতিটি আবেদনকারীর পড়াশোনার ইতিহাস, কোর্স পরিবর্তনের কারণ এবং ভিসার অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কবার্তা
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নতুন বার্তার মূল বক্তব্য হলো, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন কিংবা কোর্স শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হলে নতুন ভিসার আবেদন করার আগে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রযোজ্য নিয়ম যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে যাঁদের বর্তমান ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি, তাঁদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখা এবং আবেদন কোথা থেকে করতে হবে, তা আগেই নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়ম না মেনে অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে আবেদন করলে আবেদনটি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা আবেদনকারীর ভিসার অবস্থা ও ভবিষ্যৎ আবেদনের সুযোগে প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন ভিসার আবেদন, ভ্রমণ ও পড়াশোনার পরিকল্পনা করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
