দূর থেকে দেখলে মনে হবে, মাচায় ঝুলছে লাউ-কুমড়া। কিন্তু কাছে গেলেই দেখা মিলবে ভিন্ন চিত্র। মাচায় জাল দিয়ে তৈরি ব্যাগে ঝুলছে হলুদ, সবুজ ও ডোরাকাটা রসালো তরমুজ। সারি সারি মাচায় ঝুলে থাকা বাহারি রঙের এসব তরমুজ দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় লোকজন। প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন এই চাষে সম্ভাবনা দেখছেন এলাকার কৃষকেরাও।
ভিডিও দেখে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় প্রথমবারের মতো অসময়ে তরমুজ চাষ করে সাড়া ফেলেছেন নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের পূর্ব ডাঙাপাড়া এলাকার কৃষক ওমর আলী (৪৫)। ৩ বিঘা জমিতে ‘কিং সুগার’ ও ‘সূর্য ডিম’ জাতের মোট ৬ হাজার তরমুজের চারা রোপণ করেছেন তিনি। এখন গাছজুড়ে বাড়ছে ফল। সবকিছু ঠিক থাকলে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে খরচ বাদে প্রায় ৬ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন এই কৃষক।
সরেজমিনে দেখা যায়, জমিতে সারি সারি মাচা তৈরি করে চাষ করা হয়েছে ২ জাতের তরমুজ। বাঁশের খুঁটি, জিআই তার ও মোটা নেট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে গাছের বেড়ে ওঠার উপযোগী কাঠামো। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে ছোট-বড় নানা আকারের তরমুজ। কোনোটি হলুদ, কোনোটি কালচে সবুজ, আবার কোনোটিতে রয়েছে ডোরাকাটা দাগ। প্রতিটি তরমুজ জাল দিয়ে তৈরি ব্যাগে রাখা হয়েছে, যাতে ফলগুলো মাচায় ঝুলে থাকতে পারে।
জমির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মাচায় ঝুলে থাকা তরমুজের সারি তৈরি করেছে ব্যতিক্রমী এক কৃষিচিত্র। গাছের গোড়া ও মাচার আশপাশে নিয়মিত পরিচর্যা করছেন ওমর আলী। গাছের বর্তমান অবস্থা দেখে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তরমুজ সংগ্রহ করে বাজারজাত করবেন।
কৃষক ওমর আলী বলেন, আগে আমি শসা চাষ করতাম। একদিন ভিডিওতে নতুন জাতের এই তরমুজ চাষ দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। তখন ভাবলাম, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন এই তরমুজ চাষ করে দেখা যেতে পারে। পরে ঢাকার একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে চারা সংগ্রহ করি। এবারই প্রথম ৩ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করেছি।
তিনি আরও বলেন, ৩ বিঘার মধ্যে দুই বিঘা জমিতে কিং সুগার এবং এক বিঘায় সূর্য ডিম জাতের তরমুজ চাষ করেছি। দুই জাত মিলিয়ে ৬ হাজার চারা রোপণ করেছি। বর্তমানে গাছের বয়স ৬০ দিন। আশা করছি, ৭০ দিনের মধ্যে তরমুজ সংগ্রহ করতে পারব। ৩ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘায় খরচ পড়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। ছয় হাজার তরমুজের জন্য ৬ হাজার নেট ব্যাগ ব্যবহার করেছি। প্রতিটি তরমুজের ওজন গড়ে ৩ কেজি হলে মোট ১৮ হাজার কেজি তরমুজ উৎপাদন হতে পারে। প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৯ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে। খরচ বাদে ৬ লাখ টাকা লাভের আশা করছি।
স্থানীয় কৃষক জগদীশ রায় বলেন, এখানে নতুন ধরনের তরমুজ চাষ হতে দেখে আমরা অবাক হয়েছি। আগে এসব জমিতে ভুট্টা, গম, পাট ও ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হতো। কিন্তু এভাবে মাচায় তরমুজ চাষ আগে দেখিনি। ক্ষেতের অবস্থা ও ফলন দেখে আমাদেরও এই তরমুজ চাষ করার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, এটি লাভজনক ফসল হতে পারে।
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন, ওমর আলী অসময়ে তরমুজ চাষ করেছেন। বর্তমানে বাজারে এ তরমুজের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় কৃষক ভালো দামে তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন। পাশাপাশি ভোক্তারাও তুলনামূলক ভালো দামে তাজা তরমুজ কিনতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে তরমুজের খেত পরিদর্শন করেছি। তাকে চাষাবাদে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলন পেতে পারেন। নিজস্ব উদ্যোগে নতুন এই ফল চাষে তার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। আমরা তার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আশা করছি, উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে তিনি ভালো দাম পাবেন।
এমএমবি
