কালবেলা · সাধারণ
চেয়ারে বসতে তালা ভাঙতে হলো চুুয়েটের নতুন ভিসিকে
১২/১০/২০২৬

একজন উপাচার্যকে নিজের দপ্তরে বসতে ভবনের তালা ভাঙতে হলো, তবুও কাটেনি অচলাবস্থা। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) টানা ২১ দিনের আন্দোলনে বন্ধ ক্লাস-পরীক্ষা, চলছে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি। উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হওয়া সংকটে নতুন উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের পরও ফেরেনি স্বস্তি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে চুয়েট ক্যাম্পাসে পৌঁছান নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। পরে উপাচার্য ভবনের ফটকে লাগানো তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন।
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত বলেন, ‘আমরা একসঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করেছি।’
উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভবনের বাইরে থেকে আবার তালা লাগিয়ে দেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ‘তালা তালা তালা হবে, ভিসি ভবন তালা হবে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। একপর্যায়ে ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে নতুন উপাচার্য দপ্তরে প্রবেশ করলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তার প্রবেশের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। পরদিন ২৮ জুলাই দায়িত্ব নেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায়, ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সরিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে উপাচার্য ভবনে তালা দেওয়া হয়। পরদিন থেকে শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল করতে হবে এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ স্পষ্ট করতে হবে। তাদের বক্তব্য, নতুন উপাচার্যের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তোলা আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং আগের উপাচার্যকে সরানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এবং তাকে ফিরিয়ে আনার দাবিতেই তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
আন্দোলনের মুখে নতুন উপাচার্য এত দিন ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। ২৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর যোগদানপত্র পাঠিয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন শেখ শরীফুল আলম। তবে এতে অচলাবস্থার অবসান হয়নি। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতিতে যোগ দেন। ফলে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজেও স্থবিরতা তৈরি হয়।
অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে গড়ে ওঠা যোগাযোগ, শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ এবং বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য, সায়েম শিক্ষার্থীদের কথা সরাসরি শুনতেন, সমস্যা জানালে সমাধানের চেষ্টা করতেন এবং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতেন।
চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী সায়েম ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে জাপানের হোক্কাইডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, তার সহযোগিতায় নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইতালির শিল্পপ্রতিষ্ঠান ড্যানিয়েলিতে চুয়েটের পাঁচ প্রাক্তন শিক্ষার্থীর প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল।
শিক্ষার্থী মাহতাব হক বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের কাছে সহজলভ্য একজন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন। তাদের সমস্যা শুনে সমাধানের পথ খোঁজার আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।’
শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বলেন, ‘অধ্যাপক সায়েমের দায়িত্বকালে চুয়েটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্লাব ফেস্ট আয়োজনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। তার সময়ে ‘ডিফেন্স অ্যানালাইসিস অ্যান্ড রিসার্চ উইং’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও এগোচ্ছিল।’
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অফিস চালু, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক গবেষণা হাব ও স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল।’
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তুষার আহমেদ বলেন, ‘একজন উপাচার্য শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে চাইলে তার সঙ্গে কাজ করার আস্থা তৈরি হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফাইয়াজ অনিম বলেন, অধ্যাপক সায়েম বেশ কিছু কাজ শুরু করেছিলেন, আরও কিছু পরিকল্পনা ছিল। তাকে কাজ করার জন্য আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল।’
যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলক্বার নাঈন মিহাদ প্রশ্ন তোলেন, ‘আগের উপাচার্যের কাজে কোনো ভুল থাকলে তা তাকে জানানো হয়নি কেন।’ শিক্ষার্থী সাবিহা শবনম বলেন, ‘মুকুট পরলেই রাজা হওয়া যায় না, স্যার। পদে আসীন হওয়া আর সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা এক বিষয় নয়।’
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমও চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ইতালিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেন এবং কুয়েটে শিক্ষকতা করেন। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর তাকে কুয়েটের সহ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাঁকে ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। পরে ক্যাম্পাসে আন্দোলন ও অচলাবস্থা তৈরি হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় ৩৭ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়। ওই আন্দোলনের মধ্যে কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ ও সহ-উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। কুয়েটে দায়িত্ব পালনকালে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি সামনে এনে চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ নতুন উপাচার্যের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
চুয়েটে উপাচার্য পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সাবেক উপাচার্য সায়েমের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে জানা যায়, নিয়োগের পর থেকেই তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল। চুয়েট শাখার একটি ছাত্ররাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনের কথাও উঠে এসেছে। উপাচার্য নিয়োগে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষক সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার কারণে সায়েমকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কেউ গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
১২ অক্টোবর নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে থাকার বিষয়টি নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রশ্ন, চলমান আন্দোলনের মধ্যে ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, সোমবার দুপুরে বহদ্দারহাট ও হাটহাজারী এলাকায় তাদের গাড়ি আটকে দেওয়া হয় এবং তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। ক্যাম্পাসে নতুন উপাচার্যের আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনে যোগ দিতে আসা শিক্ষার্থীদের বাস থেকে নামিয়ে মারধর করা হয় বলেও তারা দাবি করেন। সড়কে ট্রাক দিয়ে বাস আটকে শিক্ষার্থীদের চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তাঁরা। এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিকেলে ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক সমিতিও কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ সভা হয় কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে। সভা শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বহিরাগতদের সহায়তায় নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনায় আপত্তি জানানো হয়। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় উপাচার্যকে বহন করতে হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। পূর্বঘোষিত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান বলেন, ‘অল্প সময় কাজের সুযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা ছাড়াই অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে অপমানবোধ তৈরি হয়েছে। সায়েমের কার্যক্রম ভালো ছিল এবং তিনি বেশ কিছু কাজ করছিলেন। এসব বিবেচনায় শিক্ষক সমিতি তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু কাউসার বলেন, ‘অধ্যাপক সায়েমের কাজে কোনো আপত্তি থাকলে তা তাঁকে জানানো যেত। আন্দোলনের মধ্যে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত এই অচলাবস্থার ক্ষতি শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন অধ্যাপক আবু কাউসার।’
কর্মচারী সমিতির সহসভাপতি শাহ আলম বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরবেন না। আগের উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।
সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও দাবিগুলো শুনে যৌক্তিক বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংকট নিরসনে আলোচনাকে সবচেয়ে কার্যকর পথ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা তার ছাত্র ও ছোট ভাইয়ের মতো। পারস্পরিক আস্থা তৈরি হলে সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি যেভাবে বদলে গেছে, তা তার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। সংকট সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি। আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি দেখে ক্যাম্পাসে সশরীরে উপস্থিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি বসে তাঁদের কথা শুনতে চান। তার এখতিয়ারের মধ্যে থাকা দাবি সমাধানের চেষ্টা করবেন এবং অন্য বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।’
ক্লাস শুরুর বিষয়ে নতুন উপাচার্য বলেন, ‘আবাসিক হলের ২৪তম ও ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা গত কয়েক দিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্লাস চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন। ২৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও শ্রেণিপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে লিখিতভাবে ক্লাসে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেক শিক্ষকও পাঠদান শুরু করতে চান। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্লাস শুরুর সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।’
গত তিন সপ্তাহে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ কর্মদিবসের ক্লাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একাডেমিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সেমিস্টারের বিরতি কমানো কিংবা দ্রুত ফল প্রকাশের মতো বিকল্প বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে এ জন্য সবার ইতিবাচক অংশগ্রহণ ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।’
শিক্ষার্থীদের চুয়েট ছেড়ে যাওয়ার আলটিমেটামের বিষয়েও সরাসরি আলোচনায় বসতে চান তিনি। শেখ শরীফুল আলম বলেন, আন্দোলনকে শুধু তার ব্যক্তিগত অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে পেশাদারিত্ব বজায় রেখেই সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা করেন তিনি।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের প্রসঙ্গেও ইতিবাচক মন্তব্য করেন শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, সায়েম একজন ভালো শিক্ষক ও গবেষক এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো। আগে নরওয়ের বৃত্তি নিয়ে সহযোগিতার বিষয়ে তাঁদের আলোচনা হয়েছিল। সোমবার সকালে সায়েমকে ফোন করেছিলেন; যোগাযোগ না হওয়ায় পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছেন।
ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দপ্তরের সদস্য, শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের নিয়ে সভা করার প্রস্তুতির কথাও জানান নতুন উপাচার্য। তিনি বলেন, সরকার বিভিন্নভাবে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিচ্ছে; তবে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান না হলেও আলোচনা চলছে। সরকারের একটি অংশের সঙ্গে শিক্ষক ও কর্মচারীদের যোগাযোগ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকে পরিস্থিতি বুঝে ইতোমধ্যে সরে দাঁড়িয়েছেন। দ্রুত সমস্যা সমাধান করে ক্যাম্পাসে ফিরে দায়িত্ব পালনের আশা প্রকাশ করেন তিনি। চুয়েটের কোনো ক্ষতি চান না বলেও জানান শেখ শরীফুল আলম।
উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার ও আগের উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ চেয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে খোলা চিঠি দেন তারা। পরে ২৭ সেপ্টেম্বর ও ৩ অক্টোবর আবারও হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকেও একই দাবি জানানো হয়। তবে এসব কর্মসূচির পরও ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সংকট নিরসনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ এবং চলমান সংকটের সমাধান চেয়ে তারা কর্মসূচি পালন করেন।
দীর্ঘ অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। চুয়েটের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থগিত পরীক্ষার নতুন সূচিও তখন ঘোষণা করা হয়নি।
একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, পরীক্ষাগার, গবেষণা, প্রকল্প ও চূড়ান্ত পরীক্ষা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় এসব কার্যক্রম বন্ধ থাকলে স্নাতক সম্পন্নের সময়, গবেষণার কাজ এবং চাকরিতে যোগদানের পরিকল্পনাও প্রভাবিত হতে পারে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।
১৯৬৮ সালে প্রকৌশল কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা চুয়েট ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৮টি বিভাগে শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৩৬৭ জন এবং শিক্ষক ৩৬১ জন। এত বড় একটি প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর প্রভাব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ওপর পড়তে পারে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗