পরিবারে স্তন, ডিম্বাশয়, জরায়ু কিংবা অন্ত্রের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে নিজেরও বংশগত ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ জিন পরীক্ষা বংশগতভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে এসব পরীক্ষায় সরাসরি শরীরে ক্যানসার শনাক্ত করা হয় না। বরং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এমন বংশগত জিনের পরিবর্তন খুঁজে দেখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বংশগত ক্যানসারের ঝুঁকি যাচাইয়ে বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ জিন পরীক্ষা, লিঞ্চ সিনড্রোমের জিন পরীক্ষা এবং মাল্টিজিন প্যানেল পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ জিন পরীক্ষা
বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ জিনের কিছু ক্ষতিকর পরিবর্তন স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবারে অল্প বয়সে এসব ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক এই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন। তবে পরীক্ষায় জিনের ক্ষতিকর পরিবর্তন পাওয়া গেলেই যে ক্যানসার হবে, এমন নয়।
বিভিন্ন ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পরীক্ষার খরচ সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে পরীক্ষার ধরন ও ল্যাবভেদে খরচের পার্থক্য হতে পারে।
লিঞ্চ সিনড্রোমের জিন পরীক্ষা
লিঞ্চ সিনড্রোম একটি বংশগত জিনগত সমস্যা, যা মূলত অন্ত্রের ক্যানসার এবং জরায়ুর ভেতরের আবরণ বা এন্ডোমেট্রিয়ামের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবারে একাধিক সদস্যের এসব ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক এ ধরনের পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।
এ পরীক্ষার খরচ নির্ভর করে কোন জিন পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন, তার ওপর। সব ল্যাবে এ পরীক্ষার নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা পাওয়া যায় না। তাই পরীক্ষা করানোর আগে সংশ্লিষ্ট ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে খরচ ও পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মাল্টিজিন প্যানেল পরীক্ষা
ক্যানসারের বংশগত ঝুঁকির সঙ্গে একাধিক জিনের সম্পর্ক থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা পরীক্ষা না করে একই সঙ্গে একাধিক জিনের পরিবর্তন শনাক্ত করতে মাল্টিজিন প্যানেল পরীক্ষা করা হয়। তবে সব প্যানেল পরীক্ষা বংশগত ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য তৈরি নয়। কিছু পরীক্ষা মূলত ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তির টিউমারের জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করে চিকিৎসা নির্ধারণে সহায়তা করে।
উদাহরণ হিসেবে, আইসিডিডিআর,বির ৩২টি জিনের একটি প্যানেল পরীক্ষার মূল্য ২৮ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই প্যানেল মূলত টিউমার চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই বংশগত ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য উপযুক্ত পরীক্ষা কোনটি এবং তার খরচ কত, তা সংশ্লিষ্ট ল্যাব থেকে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
কারা পরীক্ষা করাবেন?
পরিবারে অল্প বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে, একাধিক সদস্যের একই ধরনের ক্যানসার হলে কিংবা একজনের একাধিক ধরনের ক্যানসার ধরা পড়লে বংশগত ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সম্ভব হলে পরিবারে যিনি ইতোমধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, তার পরীক্ষা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। এতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে একই ধরনের বংশগত জিনগত পরিবর্তন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হতে পারে।
জিন পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ মানেই কি ক্যানসার?
জিন পরীক্ষায় ক্ষতিকর পরিবর্তন পাওয়া মানেই ক্যানসার নিশ্চিত নয়। একইভাবে, পরীক্ষায় এমন পরিবর্তন না পাওয়া গেলেও সব ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি নাকচ করা যায় না। বংশগত ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং বর্তমানে শরীরে ক্যানসার রয়েছে কি না, তা নির্ণয় করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাই শুধু পরিবারের কারও ক্যানসার হয়েছে বলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত জিন পরীক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকিভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগেভাগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। পরীক্ষা করানোর আগে সেটি বংশগত ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য উপযুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।