বিজয়া দশমীর পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে জড়ো হয়েছেন লাখো সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ভক্তদের অশ্রুসিক্ত নয়নে দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে ঢাকের তালে উৎসবের আনন্দ রূপ নিয়েছে বিষাদে।
তেল-সিঁদুর পরিয়ে, পান, মিষ্টি মুখে দিয়ে দেবীকে বিদায় জানাতে সৈকতে ভিড় করেন ভক্ত ও অনুরাগীরা। নানা ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান মিলনমেলায় পরিণত হয়।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর পূজা শেষে দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা নিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে উপস্থিত হন ভক্তরা। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সৈকত এলাকায় নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম নগরীতে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনের প্রধান আয়োজন করা হয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে। এ ছাড়া নগরীর অভয়মিত্র ঘাট, কালুরঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়।
পতেঙ্গা সৈকতে লাখো ভক্তের উপস্থিতিতে সাগরে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। সৈকতে ঢাকের তালে উৎসবের আমেজ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনা।
বুধবার দুপুর থেকেই পতেঙ্গা সৈকত এলাকায় ভিড় জমান ভক্তরা। এখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার লোক যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিসর্জন দেখতে হাজারো দর্শনার্থী। দশমীর আনুষ্ঠানিকতা সৈকতে বিসর্জন শুরু হয় দুপুর আড়াইটায়।
এর আগে সকালে ১০ উপাচারে দেবীর বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। পরে দেবীর চরণে ফুল, সিঁদুর, বেল পাতা ও মিষ্টি দিয়ে বিভিন্ন আচার পালন করে ভক্তরা। নারীরা একে অপরের মাথায় সিঁদুর ছোঁয়ান। দীর্ঘায়ু কামনা করেন পরিবারের সদস্যদের।
এদিকে বিসর্জন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার জন্য পতেঙ্গা সৈকতে কঠোর অবস্থানে ছিল পুলিশসহ বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এর পরও প্রতিমাবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশকে। এসআরবি , কোস্ট গার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর তাৎপর্য শুধু প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মনের অসুরিক প্রবৃত্তি—কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসা বিসর্জন দেওয়াও এর অন্যতম শিক্ষা। সব ধরনের নেতিবাচক প্রবৃত্তি পরিহার করে পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায় এ উৎসব।
পতেঙ্গায় বিসর্জন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এবার খুবই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে শারদীয় দূর্গাপূজা। উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন হয়েছে। এবারের মতো উৎসব বিগত ১৭ বছরেও হয়নি। আগে আমাদেরকে বিভিন্ন ভয়ভীতির মধ্যে রাখা হয়েছিল। তাই পূজা মণ্ডপে ছিল ভয় ও আতংক। কিন্তু এ বারই ব্যাতিক্রম। কোন ধরণের ভয়ভীতি আতংক ছাড়াই উৎসব করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইবোনেরা। আমাদের সরকার সব ধরণের সাপোর্ট করেছিল তাই এতো সুন্দর উৎসব আয়োজন সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যাণার্জী খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের পূজা সম্পন্ন হয়েছে। এ জন্য প্রশাসন ও সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সবার সমান অধিকার ভোগের জন্য এমনি পরিবেশ দরকার ছিল। পতেঙ্গায় দেবীর বিদায়বেলায় ভক্তদের মনে বিষাদের আবহ, আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনবেন তারা।
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. পারভেজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পতেঙ্গায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দুপুরের পর থেকে পতেঙ্গায় হিন্দু ভক্তদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের লোকেরাও ভিড় করছে। অনেকে প্রতিমা বিসর্জন দেখার জন্য পতেঙ্গায় এসেছেন।
এর আগে গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, চেরাগী পাহাড়, জামালখান, প্রবর্তক মোড়, দেওয়ানজী পুকুর, রাজাপুর লেন, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা, হাজারী লেন, নালাপাড়া, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, উত্তর কাট্টলি ও দক্ষিণ কাট্টলিসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে ছিল ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। হিন্দুশাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যান। দেবীর বিদায়ের আগে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন সনাতনী নারীরা। প্রচলিত ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করে তা নিজেদের সিঁথি ও কপালে ধারণ করেন তারা। পরে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে শুভকামনা জানান।
এসএন/
