ঋতু বদলের এই সময় সর্দি-কাশি, জ্বরের মতো নানা সংক্রমণবাহিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভোরে হালকা ঠান্ডা, বেলা বাড়লে গরম। আবহাওয়ার এই হেরফেরের মাঝে সুস্থ থাকতে নজর দিন রোজের খাবারে।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস। এমন ৭টি খাবার রয়েছে, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য শরীরের প্রয়োজন ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন, ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এই পুষ্টি উপাদানগুলি রোগ প্রতিরোধক কোষ তৈরি, কোষের ক্ষতি মেরামত এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মরশুমি ফল, তাজা শাকসবজি, আমন্ড, দানাশস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
১. লেবু, কমলালেবু ও আমলকী
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে ভিটামিন সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমলালেবু, মুসাম্বি, পাতিলেবু ও আমলকীর মতো ফলে রয়েছে এই ভিটামিন। এটি শ্বেত রক্তকণিকার স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরের কোষকে ক্ষতিকর পদার্থের প্রভাবে হওয়া ক্ষতি থেকে রক্ষা করতেও ভূমিকা নেয়। তাই প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল রাখুন। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে শুধু ভিটামিন সি-র উপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

২. সবুজ শাকপাতা
পালং শাক, মেথি শাক-সহ বিভিন্ন সবুজ শাক ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের ভালো উৎস। পালং শাকে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরিতে সাহায্য করে। এই ভিটামিন ত্বক এবং নাক, গলা ও শ্বাসনালির ভিতরের আবরণ সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শাকপাতায় থাকা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. বাদাম ও বিভিন্ন বীজ
আমন্ড, আখরোট ও কুমড়োর বীজের মতো খাবারে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন ই এবং জিঙ্কের মতো খনিজ। আমন্ডে থাকা ভিটামিন ই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, কুমড়োর বীজে থাকা জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধক কোষের স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য প্রয়োজনীয়। আখরোটে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এই পুষ্টি উপাদানগুলি শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই পরিমিত পরিমাণে বাদাম ও বীজ খেতে পারেন।

৪. আদা ও রসুন
ভারতীয় রান্নায় আদা ও রসুনের ব্যবহার বহুদিনের। খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলিতে রয়েছে কিছু উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ। আদায় থাকা জিঞ্জেরল নামের যৌগের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহ কমানোর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রসুনে থাকা অ্যালিসিন-সহ বিভিন্ন সালফারযুক্ত যৌগ নিয়েও নানা গবেষণা হয়েছে। রান্নায় নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে আদা ও রসুন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এগুলি খেলেই সর্দি-কাশি বা অন্য কোনও সংক্রমণ ঠেকানো যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।

৫. দই ও গাঁজানো খাবার
দইয়ে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া। দইয়ের ধরন ও তৈরির পদ্ধতির উপর নির্ভর করে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে। উপযুক্ত উপকারী অণুজীব অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর অন্ত্রের সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দইয়ের পাশাপাশি ইডলি ও ধোসার মতো গাঁজানো খাবারও সুষম খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।

৬. ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। শরীরের কোষ ও কলা তৈরি এবং মেরামতির পাশাপাশি অ্যান্টিবডি তৈরিতেও এর ভূমিকা রয়েছে। ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের ভালো উৎস। এতে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম-সহ আরও কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। নিরামিষভোজীরা ডাল, ছোলা, রাজমা, পনির, দুধ ও সয়াজাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন পেতে পারেন। আমিষভোজীদের খাদ্যতালিকায় মাছ ও কম চর্বিযুক্ত মাংসও থাকতে পারে। শুধু ফল ও শাকসবজি খেলেই হবে না, প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিনও থাকা প্রয়োজন।

৭. মিষ্টি আলু, গাজর ও মরশুমি সবজি
গাজর, মিষ্টি আলু ও কুমড়োর মতো সবজিতে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, যা শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। এই ভিটামিন ত্বক এবং শ্বাসনালির ভিতরের আবরণ সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ফলে শরীরের বাইরের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে। গাজরে রয়েছে ফাইবার, যা হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, মিষ্টি আলু শরীরকে শক্তি জোগায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙিন মরশুমি সবজি রাখলে শরীর প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান পায়।
সুস্থ থাকতে শুধু খাবার নয়, অভ্যাসও জরুরি। ঋতু পরিবর্তনের সময় কোনও একটি বিশেষ খাবারের উপর নির্ভর না করে সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যতালিকা মেনে চলুন। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত জল পান এবং হাত পরিষ্কার রাখার মতো অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় টিকা নিন। মনে রাখবেন, কোনও খাবারই সংক্রমণ সম্পূর্ণ ঠেকাতে পারে না। জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনও উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
