ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই।! বরং বড় দল হতে গেলে সেই স্বপ্ন থাকতেই হয়। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যখন বারবার তৈরি হয় বিশাল ব্যবধান, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন সেই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বড় টুর্নামেন্টের আগে শিরোপার প্রত্যাশা শোনা যায়, কিন্তু মাঠে নামলেই ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুর চেহারা বেরিয়ে আসে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭ উইকেটের হারে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিদায়ের পর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়ও স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই!
আবুধাবিতে ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। ফাইনালে যেতে হলে আফগানিস্তানকে অন্তত ৪১ রানে হারানোর বিকল্প ছিল না। সে কারণেই টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হৃদয়। প্রয়োজন ছিল বড় সংগ্রহের, অথচ শুরুতেই সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। ১.৩ ওভারে ৬ রানে দুই উইকেট, সাত ওভার পার হওয়ার আগেই ২৮ রানে চার উইকেট নেই। সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভার খেলার আগেই ১৬০ রানে গুটিয়ে যায় দল। অথচ উইকেট ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো। ২৮ রানে চার উইকেট হারানোর পর পারভেজ হোসেন ইমন ও সাইফ হাসানের ৯৩ রানের জুটি কিছুটা সম্মান বাঁচিয়েছে। তাদের এই প্রতিরোধ না থাকলে বাংলাদেশের স্কোর আরও বিব্রতকর হতে পারত। আফগানিস্তান অবশ্য ৭ উইকেট হাতে রেখেই সহজ জয় তুলে নেয়।
ম্যাচের পর হৃদয়ের বক্তব্যে ছিল না কোনো অজুহাত। বরং দলের দীর্ঘদিনের সমস্যাটিই সামনে এনেছেন তিনি। বড় টুর্নামেন্টে ট্রফি জয়ের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সেই লক্ষ্য পূরণের মতো পারফরম্যান্স দেখাতে পারছে না বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে হৃদয় বলেন, ‘আমরা বড় কোনো সিরিজ, ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপে যখন খেলতে যাই, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে সবাই ট্রফি জিততে চাই। কিন্তু আমরা শুধু মুখেই বলি, কাজে সেটার প্রতিফলন দেখা যায় না।’
কথাটা শুধু একটি ম্যাচের ব্যর্থতা নিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। শুরুতে উইকেট হারানো যেন দলের নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে মিডল অর্ডারের কাছ থেকে দায়িত্বশীল ইনিংস পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে সেই জায়গাটিও এখন প্রশ্নের মুখে। দলে প্রকৃত মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের অভাব আছে কি না, সেই আলোচনাও সামনে আসছে।
কারণ, ব্যাটিং অর্ডারে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাদের মূল পরিচয় ওপেনার হিসেবে। কেউ কেউ আবার ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো পর্যায়ে ওপেন করেছেন। ফলে শুরুতে বিপর্যয় এলে ইনিংস পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও ভূমিকার বৈচিত্র্য কতটা আছে, সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
তবে হৃদয় কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে দায়ী করতে চাননি। ব্যর্থতার দায় পুরো ব্যাটিং ইউনিটের ওপরই দিয়েছেন তিনি। পাইপলাইনে খেলোয়াড়ের অভাব আছে কি না, এমন প্রশ্নে তার উত্তর, ‘একটা জায়গা নিয়ে বলতে চাচ্ছি না; কারণ, ব্যাটিং ইউনিট পুরাটাই একসঙ্গে ব্যর্থ হয়েছি। পাইপলাইনে অবশ্যই পর্যাপ্ত খেলোয়াড় আছে।’
সমস্যা যে শুধু আফগানিস্তান ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও তা বলে দিচ্ছে। একসময় ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা ছিল ব্যাটিং। ঘরের মাঠে বড় দলগুলোর বিপক্ষে সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাসও ছিল। কিন্তু দেশের বাইরে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জিম্বাবুয়ে সফরে ১৪১ রান তাড়া করতে পারেনি বাংলাদেশ, পরের ম্যাচে ২৩৪ রানের লক্ষ্যও পেরোতে পারেনি। এরপর আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজে দুই ম্যাচের কোনোটিতেই দুই শ রান করতে পারেনি দল।
একের পর এক ব্যর্থতার পরও পুরো দলকে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখতে চান না হৃদয়। তার মতে, কয়েকটি ম্যাচ বা সিরিজ দিয়ে পুরো দলকে বিচার করা ঠিক হবে না। তবে দেশের বাইরে ব্যাটিং ইউনিটের ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যাননি, ‘একটা-দুটো ম্যাচ বা এক-দুইটা সিরিজ দিয়ে আমি পুরো দলকে বলতে চাই না যে, দলের কী হলো! আমি বলব দল ভালো অবস্থায় আছে, কিন্তু আমরা ব্যাটিং ইউনিট বাইরে যে কয়টা ম্যাচ খেলেছি, টানা খুব বাজে ব্যাটিং করেছি। যে কারণে পুরো দলই ভুগছে।’
তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরু হতে এক বছরেরও কম সময় বাকি। তার আগে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষেই যদি ব্যাটিংয়ের এমন দশা হয়, তাহলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই। টপ অর্ডারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, মিডল অর্ডারের অনিশ্চয়তা এবং চাপের মুখে ইনিংস ধরে রাখতে না পারার সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
হৃদয়ও জানেন, উন্নতির বিকল্প নেই। নিজেরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন বলে স্বীকার করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা দিনের পর দিন একই ভুল করছি। ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আবারও ভুল করছি। শুরুতেই কয়েকটা উইকেট হারিয়েছি। ওইটাই আসল কারণ। টপঅর্ডারে রান করতে হবে। নাহলে আপনি টিকতে পারবেন না। আমরা এটা নিয়ে কাজ করব।’
এমনকি ব্যাটিং বিপর্যয়ের পেছনে উইকেট কিংবা কন্ডিশনকেও দায়ী করেননি তিনি। বরং স্বীকার করেছেন, ‘আমরা ১০০ রান কম করেছি। উইকেট খুবই ভালো ছিল।’
সবশেষে ঘুরে দাঁড়ানোর আশার কথা শুনিয়েছেন হৃদয়। সামনে ঘরের মাঠে এশিয়া কাপকে দেখছেন নিজেদের নতুন করে প্রমাণের সুযোগ হিসেবে। তার বক্তব্য, ‘ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ আমাদের জন্য বড় সুযোগ। আমাদের অবশ্যই ভালোভাবে বসে বা যেকোনোভাবে দলটাকে ভালো একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে; কারণ, এশিয়া কাপ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ। আশা করি, ইনশাআল্লাহ আমরা ভালো কিছু করব।’
কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন আশার কথা নতুন নয়। ব্যর্থতার পর আসে আত্মসমালোচনা, এরপর উন্নতির প্রতিশ্রুতি, তারপর নতুন টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। অথচ মাঠের চিত্র খুব একটা বদলায় না!
