একটি নেশা কীভাবে একটি তরুণের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারে, একটি পরিবারের শান্তি ভেঙে দিতে পারে, এমনকি একটি জনপদের নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে—মাদকের বিস্তার সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে আনছে। শহর থেকে গ্রাম, পাড়া-মহল্লা থেকে জনপদের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। বিপন্ন হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। এ সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে, যার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণা অনুসারে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এই গবেষণায় (ফেব্রুয়ারি-জুন ২০২৫) দেখা গেছে, গাঁজা ব্যবহারকারী প্রায় ৬১ লাখ, ইয়াবা বা মেথামফেটামিন ব্যবহারকারী প্রায় ২৩ লাখ এবং অ্যালকোহল ব্যবহারকারী প্রায় ২০ লাখ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় সর্বাধিক প্রায় ২২.৯ লাখ, চট্টগ্রামে ১৮.৮ লাখ এবং রংপুরে ১০.৮ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করেন। হারের দিক থেকে ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬%) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০%) বিভাগ শীর্ষে। চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হওয়া মাদকাসক্তদের প্রায় ৭০ শতাংশই ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন। এই পরিসংখ্যানই সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপকতা তুলে ধরে।
মাদকবিরোধী প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। জাতীয় নির্বাচন থেকে স্থানীয় নির্বাচন—সব পর্যায়েই প্রার্থীরা মাদক নির্মূলের অঙ্গীকার করেন। কেউ ঘোষণা দেন ‘জিরো টলারেন্সের’, কেউ বলেন, তার এলাকায় মাদক প্রবেশ করতে দেবেন না। কিন্তু নির্বাচনের পর এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা হয়, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান শুরু হলেও কিছুদিন পর তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়দাতা বা রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক ব্যবসা চলার অভিযোগও রয়েছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় বহু বছর ধরে মাদক চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তার নাম থাকলেও পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধীদের রক্ষাকবচ না হয়। মাদকবিরোধী অঙ্গীকারের সত্যতা প্রমাণিত হবে কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব পরীক্ষা হতে পারে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও। দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য, নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন এবং প্রার্থীদের অতীত ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যারা মাদকবিরোধী কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। বিপরীতে, যাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে, তাদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। একইভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীর জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে অনুমোদিত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান বা পরীক্ষাগারের ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন ও নির্বাচনি বিধিমালা সংশোধনের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। তবে পরীক্ষার ফলের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ রাখা এবং বৈধ ওষুধ সেবনের কারণে ভুল ফল এলে তা যাচাই করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রার্থিতার যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টিও স্পষ্ট আইনি বিধানের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলের গোপনীয়তা রক্ষা এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলর—সব পর্যায়ের প্রার্থীর ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছ প্রার্থী বাছাই স্থানীয় পর্যায়ে মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একসময় মাদক ব্যবসাকে বস্তিকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন গ্রামেগঞ্জেও এর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অপরাধের পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই ও কৃষিপণ্য চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। যদিও এসব অপরাধের সবকিছুর পেছনে মাদককে একমাত্র কারণ বলা যায় না, তবু মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই।
সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন অনেক গ্রামীণ কৃষক। কষ্টে উৎপাদিত ফসল চুরি হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও চোরেরা দরজা-জানালা কেটে ঘরে ঢুকে ফসল ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকের শ্রমের ফসল যদি নিরাপদ না থাকে, তবে গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতি—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে রাতের নিরাপত্তা, নিয়মিত টহল এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
মাদকের অভিঘাত পরিবার ও দাম্পত্য জীবনেও ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে। মাদকাসক্তিকে কেন্দ্র করে কলহ, আর্থিক অনটন এবং বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। শ্রীপুর উপজেলার রাজাপুর গ্রামে গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের শেষ প্রহরে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটির পেছনে মাদক সেবন ও ব্যবসার যোগসূত্র ছিল। স্বামীকে মাদকাসক্তি থেকে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তিতে অতিষ্ঠ স্ত্রী তাকে হত্যা করেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর তিনি নিজ বাড়িতে চলে যান এবং নিজেই স্বীকার করেন যে তিনিই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। বর্তমানে তিনি হাজতবাসে আছেন। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, মাদকজনিত পারিবারিক সংকটকে অবহেলা করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং কখনো কখনো গণমাধ্যমেও এমন খবর প্রচারিত হয় যে, কিছু বখে যাওয়া যুবক স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেদের মাদকাসক্ত করার চেষ্টা করে, যাতে পরবর্তী সময়ে তাদের অর্থে মাদক সেবনের সুযোগ নিতে পারে। একইভাবে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার কথাও উঠে আসে। এ ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে একই দৃষ্টিতে দেখা সমস্যার সমাধান নয়; বরং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনাই হওয়া উচিত কার্যকর পদক্ষেপ।
সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অভিযান চলাকালে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। মাদক দমনে নিজের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন সঠিক না হলেও তার উদ্দেশ্য জনস্বার্থে কাজ করাই ছিল বলে মনে হয় এবং মাদক দমনে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একজন মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতার মূল দায়িত্ব হলো কার্যকর আইন প্রণয়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগে সহায়তা করা। ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা কোনো একক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসায়ীরা যেন কোনোভাবেই উৎসাহিত বা স্বস্তিবোধ না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারত্ব ও আইনানুগ পদ্ধতিতে ধারাবাহিক এবং আরও জোরদার অভিযান পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা মাদকবিরোধী লড়াইয়ে ভাটা আনতে পারে না; বরং এমন পরিস্থিতিতে অভিযান আরও নিবিড় ও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এ জন্য পুলিশের মনোবল, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি, অবহেলা কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও জরুরি। পুলিশকে যেমন কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, তেমনি জবাবদিহির আওতায়ও রাখতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় অভিযান শুরুর আগেই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে এর খবর পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তারা আগেভাগে আত্মগোপন করে, আর অভিযানে মূলত মাদক বহনকারী বা ছোট পর্যায়ের কারবারিরাই ধরা পড়ে। আড়ালে থেকে যায় বড় মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অভিযানের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত করা এবং মাদকের সরবরাহব্যবস্থার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। অভিযানের সাফল্য শুধু কতজন গ্রেপ্তার হলো বা কত পরিমাণ মাদক জব্দ হলো, তা দিয়ে নয়; বরং মাদকের মূল উৎস ও বড় কারবারিদের নেটওয়ার্ক কতটা ভাঙা গেল, তা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।
মাদকবিরোধী লড়াই কেবল অভিযাননির্ভর হলে চলবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থায়ন শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইয়াবার মূল উৎস মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা; বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চল দিয়ে তা প্রবেশ করে। ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা আসে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ বেশি। অথচ মাদক মামলায় খালাসের হার অনেক বেশি—কখনো ৫৫ থেকে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত। প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৬ জেলার ৫০০টি মাদক মামলার মধ্যে ৫৯ শতাংশে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে প্রমাণ হয়, কেবল আটক নয়, তদন্তের মান ও বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতাও বড় সমস্যা।
অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-এর সহযোগিতায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, মাদকের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা) পাচার হয়। এই অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করা গেলে কতটা পরিবর্তন আসত, তা সহজেই অনুমেয়।
তাই এখন প্রয়োজন বহুমাত্রিক কৌশল। সীমান্ত নজরদারি জোরদার করতে হবে—ড্রোন, সিসিটিভি, নৌ ও স্থলপথে সমন্বিত টহল এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা পুনর্বাসন তহবিলে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ মাদক আদালত বা দ্রুত বিচারব্যবস্থা চালু করে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত সচেতনতা ও কাউন্সেলিং, যুবকদের খেলাধুলা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা এবং পরিবারভিত্তিক হস্তক্ষেপ জরুরি।
প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক প্রচার ও নিয়োগ রোধে নজরদারি, মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল অর্থ লেনদেন অনুসরণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের সংখ্যা ও মান বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা সুস্থ হয়ে সমাজে ফিরে আসতে পারেন।
এখন আর লোকদেখানো অভিযান বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে না। দরকার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার কার্যকর ভূমিকা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সরকারকে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে, আর সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। আজই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্মকে এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে। মাদকবিরোধী লড়াই তাই কোনো দলের নির্বাচনী স্লোগান নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার অপরিহার্য দায়িত্ব।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ফরিদপুর সিটি কলেজ
ইমেইল: mmrrajbari71@gmail.com
