‘অনৈতিক কাজ’। মাত্র দুটি শব্দ। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির এই দুটি শব্দের ভারেই ১৪ অক্টোবর শেষ হয়ে গেছে দুটি জীবন—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের। মক্কায় এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, উপযুক্ত আদালতে তাঁদের বিচার হয়েছে এবং আপিলেও রায় বহাল ছিল। কিন্তু মক্কার একটি মসজিদে ঠিক কী ঘটেছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি। আমরাও জানি না।
সৌদিপ্রবাসী এবং তাঁদের পরিবার—দুই ভিন্ন দেশে বসে যাঁরাই খবরটি জানছেন মুঠোফোন, টিভি কিংবা পত্রিকার পাতা থেকে, এই লেখা তাঁদের মনের বিশ্লেষণ নয়। মসজিদের পবিত্রতাকেও এখানে প্রশ্ন করা হচ্ছে না; কোটি মুসলমানের কাছে তা গভীর শ্রদ্ধার বিষয়। প্রশ্ন শাস্তির মাত্রা নিয়ে। যাঁদের কথা আমরা কখনো শুনিনি, যাঁরা আর নিজেদের পক্ষে কিছু বলতে পারবেন না, তাঁদের নিয়ে অনুমান করা অন্যায়। আমার প্রশ্ন বরং আমাদের নিয়ে: একটি সমাজ কেন এত কঠোর শাস্তি দাবি করে? দূরে বসে খবরটি পড়ে আমাদের মনে কী ঘটে? আর এই একটি ঘটনা কত মানুষের জীবনে কত গভীর ক্ষত রেখে যায়?
এই প্রশ্ন কোনো একটি দেশ বা ধর্মের নয়; পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই পবিত্রতা ও শাস্তির সম্পর্ক জটিল। সিগমুন্ড ফ্রয়েড টোটেম অ্যান্ড ট্যাবু গ্রন্থে মানবসমাজের আদি রীতিনীতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, যে ট্যাবু ভাঙে, সমাজ তাকে ছোঁয়াচে বিপদ হিসেবে দেখে; আর শাস্তির মধ্য দিয়ে গোষ্ঠী নিজের সীমানা ও ঐক্যকে নতুন করে নিশ্চিত করতে চায়। নৃবিজ্ঞানী মেরি ডগলাস আরেক দিক থেকে একই কথা বলেছেন: সমাজ যাকে ‘অশুচি’ বলে, তা আসলে নিজের জায়গার বাইরে থাকা কিছু। সীমানা যত পবিত্র, লঙ্ঘনের ভয় তত তীব্র। প্রতিটি সংস্কৃতিতেই উপাসনালয় সেই সীমানার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা।
মনোবিশ্লেষক ফ্রানৎস আলেক্সান্ডার ও হুগো স্টাউব প্রায় এক শতাব্দী আগে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছিলেন: জনগণ কেন অপরাধীর কঠোর শাস্তি চায়? তাঁদের উত্তর ছিল, অন্যকে শাস্তি দিয়ে আমরা নিজের ভেতরের অবদমিত ইচ্ছাকেও শাসন করি। শাস্তি যখন অপরাধের অনুপাত ছাড়িয়ে যায়, তখন তা হয়তো অপরাধীর চেয়ে শাস্তি দাবি করা সমাজের মন সম্পর্কেই বেশি কথা বলে—সেই সমাজ আমাদেরটাও হতে পারে।
চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞানী ন্যান্সি শেপার-হিউজ ও মার্গারেট লক দেহকে তিনভাবে পড়তে শিখিয়েছেন। একটি ব্যক্তির দেহ—রক্ত-মাংসের মানুষ, যাঁর ক্ষুধা, ক্লান্তি, ভালোবাসা ও ভয় আছে। একটি সামাজিক দেহ—যা পবিত্রতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। আর একটি রাষ্ট্রীয় দেহ—যার ওপর রাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মিশেল ফুকো দেখিয়েছিলেন, শাস্তিপ্রাপ্ত দেহ আসলে ক্ষমতার ঘোষণা: সেই দেহের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সবাইকে জানিয়ে দেয়, সীমানা কোথায়। মক্কার ঘটনায় শেষ দুটি দেহের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে—পবিত্র স্থান, পবিত্র সময়, রাজকীয় আদেশ। সবচেয়ে কম জায়গা পেয়েছে প্রথমটি: দুটি মানুষ নিজেই।
একজন প্রবাসী শ্রমিকের জীবনে এই নির্ধারকগুলো একসঙ্গে জমা হয়: ধারদেনা করে বিদেশযাত্রা, নিয়োগকর্তানির্ভর কাফালা ব্যবস্থা (আংশিক সংস্কারের পরও যার প্রভাব রয়ে গেছে), অচেনা ভাষার আইন-আদালত, বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা আর একাকিত্ব। চিকিৎসক-নৃবিজ্ঞানী পল ফারমার একে বলেছেন ‘কাঠামোগত সহিংসতা’—যেখানে কেউ হাত না তুললেও ব্যবস্থাটিই মানুষকে ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,০৬০ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে—গড়ে প্রতিদিন ১৪টির বেশি; আর এ বছর শুধু সৌদি আরবেই মারা গেছেন প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক। তবে এই সংখ্যাকে মৃত্যুদণ্ডের হিসাব ভাবলে ভুল হবে: একই প্রতিবেদন বলছে, এ বছরের ৬৬ শতাংশ মৃত্যু নথিতে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে লেখা, আর ১৬ শতাংশের বেশি সড়ক বা কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, আগুন, উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা বিদ্যুতায়িত হয়ে; বিদেশে মৃত্যুর কারণ বাংলাদেশ আলাদাভাবে যাচাইও করে না। তবু এই সংখ্যাগুলো একই কাঠামোগত ভঙ্গুরতার ছবি দেখায়।
একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ জেদ্দা কনস্যুলেটকে প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি বন্দীর একটি তালিকা দিয়েছিল; সম্প্রতি দণ্ডিত দুজনের নাম তাতে থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের কোনো উল্লেখ ছিল না। কনস্যুলেট আরও জানিয়েছে, তাঁদের কেউ কনস্যুলার সহায়তাও চাননি। তাঁরা কি জানতেন, কার কাছে, কীভাবে সাহায্য চাইতে হয়? প্রশ্ন জাগে, আদালতে দাঁড়ানোর আগেই কি তাঁরা এক অসম লড়াইয়ে পিছিয়ে ছিলেন? ক্ষমতা, অর্থ ও সুরক্ষার জোর থাকলে কি পরিণতি ভিন্ন হতে পারত?
এমন খবর দেশে পৌঁছালে আমাদের মনও আত্মরক্ষার কৌশল খোঁজে। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত শোনা যায়, ‘আইন ভাঙলে শাস্তি তো পেতেই হবে’—এভাবে যুক্তি দিয়ে মৃত্যুর ভার হালকা করা হয়। অনেকে নীরব থাকাই নিরাপদ মনে করেন, যেন কিছুই ঘটেনি। কখনো শোনা যায়, ‘ওরা দেশের মুখে কালি দিয়েছে’—তখন লজ্জা ঢেকে দেয় সহমর্মিতাকে। মনোবিশ্লেষক মেলানি ক্লাইনের ভাষায় এটি বিভাজন: মানুষটিকে পুরোপুরি ‘খারাপ’ বানিয়ে ফেলা, যাতে তাঁর জন্য কষ্ট পেতে না হয়। কিন্তু এই আত্মরক্ষা আমাদের কী কেড়ে নেয়? দুটি মৃত্যুকে মানুষের মৃত্যু হিসেবে অনুভব করার ক্ষমতা।
দুটি পরিবার আজ এমন এক শোক বইছে, সমাজ যাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। শোক-গবেষক কেনেথ ডোকা এর নাম দিয়েছেন ‘অস্বীকৃত শোক’। নৃবিজ্ঞানী রবার্ট হের্ৎস দেখিয়েছিলেন, শেষকৃত্যের আচার মৃতকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় দেয় এবং জীবিতের শোককে একটি আকার দেয়। রাষ্ট্রই যখন দণ্ড কার্যকরের কথা আগে জানতে পারেনি, তখন পরিবার কি শেষ মুখ দেখা বা জানাজার কোনো সুযোগ পেয়েছিল? মরদেহ কোথায়, ফিরবে কি না—এ প্রশ্নগুলোও শোককে অসমাপ্ত রাখে। ফ্রয়েড সতর্ক করেছিলেন, যে শোক প্রকাশের পথ পায় না, তা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতায় রূপ নেয়।
এই ঘটনার ক্ষত দুটি মৃত্যুতে থামে না। প্রথম আঘাত পরিবারের ওপর: উপার্জন হারানোর ধাক্কা, সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, প্রতিবেশীর কানাকানি। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান যাকে কলঙ্ক বলেছেন, তা অভিযুক্ত থেকে ছড়িয়ে পড়ে নির্দোষ স্বজনের গায়েও, আর মানুষকে ধীরে ধীরে সম্পর্ক, কাজ ও সেবা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। দ্বিতীয় আঘাত প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সৌদি আরবে কর্মরত ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশির মনে সেই প্রশ্নটিই ঘুরে বেড়ায়, যা রিয়াদের ওই তরুণের মনে জেগেছিল। তৃতীয় আঘাত গোটা সমাজের ওপর, যে সমাজ নিজের মানুষের মৃত্যুকে লজ্জা দিয়ে ঢেকে দেয়, সেখানে সহমর্মিতার বন্ধন দুর্বল হয়। চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সামাজিক যন্ত্রণা’—যে কষ্টের উৎস ব্যক্তি নয়, সমাজের ক্ষমতার বিন্যাস।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, প্রতিরোধ: বিদেশযাত্রার আগের প্রশিক্ষণে গন্তব্য দেশের আইন, শাস্তি ও বিপদে সহায়তা পাওয়ার পথ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সুরক্ষা: শ্রমবহুল দেশগুলোর মিশনে আইনি সহায়তার পাশাপাশি মনোসামাজিক সহায়তা ডেস্ক, আর প্রবাসী সংগঠনগুলোকে পারস্পরিক সহায়তার নেটওয়ার্ক হিসেবে গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, পুনর্বাসন: শোকগ্রস্ত পরিবারের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক শোক-পরামর্শ, আর্থিক সহায়তা ও সন্তানদের শিক্ষার নিশ্চয়তা। আর গণমাধ্যমের দায়: দণ্ডিত মানুষ ও তাঁদের স্বজনদের মর্যাদা রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন, যাতে শিরোনাম কলঙ্কের নতুন উৎস না হয়ে ওঠে।
মনোবিশ্লেষণ রায় দেয় না, প্রশ্ন করে। সামাজিক স্বাস্থ্য সেই প্রশ্নকে মন থেকে সমাজের কাঠামোয় নিয়ে যায়, আর চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞান দেখায়, সংস্কৃতি ও ক্ষমতা কীভাবে মানুষের দেহে নিজেদের অর্থ লিখে দেয়। তাই আসল প্রশ্নটি ‘তাঁরা অপরাধী ছিলেন কি না’ নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের মনের কোন ভয় আর সমাজের কোন ফাঁক দুটি মানুষের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে সাহায্য করছে? সেই ভয় ও ফাঁক চিনতে পারলেই নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারকে আবার মানুষ হিসেবে দেখতে পারব—সংবাদ শিরোনাম হিসেবে নয়।
