বিএনপিতে হাফ ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী, জামায়াতের একক
রাজশাহী সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গন
রাজশাহী সিটি করর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচন সামনে রেখে ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে মহানগরী। নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতায় নগরজুড়ে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে।
মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী
রাজশাহী সিটি করর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচন সামনে রেখে ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে মহানগরী। নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতায় নগরজুড়ে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। পাড়া-মহল্লা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রচার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে প্রভাব পড়বে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল, মাঠে আ’লীগ না থাকা এবং বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন।
আগামী রাসিক নির্বাচনে মূল আলোচনায় রয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির অন্তত ছয় নেতা মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে দলীয় মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও তাদের প্রার্থী হিসেবে মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীর নাম ঘোষণা করেছে। ফলে নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা।
রাজশাহী মহানগর বিএনপিতে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত, সাবেক মেয়র ও কেন্দ্রীয় বিএনপির বন ও পরিবেশ সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন, সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ও আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট এবং সহ-সভাপতি ওয়ালিউল হক রানা। তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত কাউকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন, সেটিই এখন মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে অন্যতম আলোচনার বিষয়। এদিকে সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের রাসিক নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ২০১৩ ও ২০১৮ সালে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে গত ১২ জুলাই বন উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কয়েক মাস ধরে রাজশাহীর রাজনৈতিক মাঠেও তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি এবারও মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী। অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের তৎপরতা নগরীতে দৃশ্যমান। দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও ক্রীড়া সংগঠনের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ব্যানার-ফেস্টুনও রয়েছে। আরডিএ চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইটও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয়। মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত মেয়র পদে জোর লবিং করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুনও বিভিন্ন দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচন করবেন বলে তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
ডাঃ জাহাঙ্গীরকে ঘিরে জামায়াতের প্রস্তুতি
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। গত আগস্টে দলটি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে আগামী রাসিক নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে। জাহাঙ্গীর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ সদর আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. জাহাঙ্গীর পান ১ লাখ ৩৭০ ভোট। অর্থাৎ দুজনের ভোটের ব্যবধান ছিল ২৮ হাজার ১৭৬। এই ফলাফলকে সামনে রেখে এবার রাসিক নির্বাচনেও ডা. জাহাঙ্গীরকে ঘিরে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে জামায়াত। দলটির নেতারা বলছেন, মহানগরীতে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক সভা, সুধী সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে তারা নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছেন। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের প্রচার বিভাগ জানায়, “সিটি নির্বাচনে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে বিজয়ী করতে বিশেষ গণসংযোগ কর্মসূচি চলছে। প্রার্থীর সমর্থনে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সুধী সমাবেশসহ স্থানীয় কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিচ্ছেন। পরে দলের পক্ষ থেকে আরা কর্মসূচি আসবে।” অপর দিকে জামায়াতের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কয়েক মাস আগেই মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তিনিও বিভিন্ন নির্বাচনমুখী কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
এদিকে গত ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনও মহানগরীর রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজশাহী-২ আসনে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু ও জামায়াতের মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ফলে একই নগরীর দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারো প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও রাসিক নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার কারণে বিএনপি’র প্রার্থীকে অবশ্যই ব্যক্তিগত ইমেজের লড়াইতেও নামতে হবে। সব মিলিয়ে রাসিক নির্বাচন ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিএনপির ছয় মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্য থেকে কে পাবেন দলীয় টিকিট, আর জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থী ডা. জাহাঙ্গীর ও এনসিপির মোবাশ্বের আলীসহ অন্য প্রার্থীরা কীভাবে নিজেদের নির্বাচনী অবস্থান তৈরি করবেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই এই প্রতিযোগিতা আরো স্পষ্ট হবে।
