রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ধরনের উদ্যোগে সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছে কিয়েভ। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি মস্কো। খবর বিবিসি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রথমে ট্রাম্পের এ ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। পরে তিনি বলেন, মস্কোও রাজি হলে কিয়েভ এ উদ্যোগে সমর্থন দেবে। তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরও তার দেশের জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়া হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রুশ জ্বালানি তেল অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধের জন্য কয়েক মাস ধরে চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। কিয়েভের দাবি, যুদ্ধ পরিচালনায় রুশ অর্থায়ন কমাতে এসব স্থাপনায় হামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে সম্প্রতি হওয়া একটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে রাশিয়া। এ চুক্তি বাস্তবায়নের পথ সুগম করতেই ট্রাম্প ইউক্রেনকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার এ চুক্তি নিয়ে সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে। জেলেনস্কি একে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য উপহার বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজনসহ মার্কিন কিছু রাজনীতিকও চুক্তিটির বিরোধিতা করেছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে ট্রাম্পের এ চুক্তিকে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন তিনি। ওই যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, বিশেষ করে ডিজেলের দাম। জ্বালানি পাম্পে বেশি দাম দিতে গিয়ে মার্কিন নাগরিকরা চাপে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে গতকাল জেলেনস্কি বলেন, জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি তার কাছে নতুন খবর। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন তার কর্মকর্তারা।
জেলেনস্কি বলেন, ‘রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না চালাতে ইউক্রেন প্রস্তুত। রাশিয়াও একই ধরনের প্রস্তুতি নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে সম্মতি দেবেন বলে আমরা আশা করছি।’
তবে পরে জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার একটি ড্রোন কিয়েভের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হয়।
জেলেনস্কি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জ্বালানি যুদ্ধবিরতি নিয়ে বক্তব্য দেয়ার পরই এসব ঘটনা ঘটেছে।’
কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের সামরিক অভিযানকে সহায়তা করে এমন স্থাপনাগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে রুশ ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনের হামলাকে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নের সক্ষমতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন জেলেনস্কি।
এসব হামলায় উভয় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারাও চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। তিনজন ডেমোক্র্যাট ও চারজন রিপাবলিকানসহ সাত মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের এ চুক্তি এমন একটি আইনের সরাসরি পরিপন্থী, যেখানে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বিবৃতিতে তারা বলেন, কংগ্রেসের অবস্থান স্পষ্ট— ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ এবং ন্যাটোর মিত্রদের হুমকি দেয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা উচিত নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
চুক্তিটির বিরোধিতাকারী সাত সিনেটরের একজন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস এনবিসি নিউজকে বলেন, এ চুক্তি ‘নিশ্চিতভাবেই’ মার্কিন নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
গত শনিবার রুশ জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন ট্রাম্প। ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করায় জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হামলার অনুমোদন দিয়ে ‘বিশ্বের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চান’।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ‘ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে।’
এর জবাবে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করবেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালে ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানানো হলে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জেলেনস্কি। তার যুক্তি ছিল, দেশের যেসব এলাকায় যুদ্ধ চলছে বা যেগুলো রাশিয়ার দখলে রয়েছে, সেখানে নির্বাচন আয়োজন করা জটিল।
তবে ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করে আসছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন জেলেনস্কি।
