রোজ ৮ ঘণ্টা ঘুমোতেই হবে— সুস্থ থাকার মূলমন্ত্রের তালিকায় এমন কথা প্রায়শই শোনা যায়। কিন্তু জাপানের দিকে তাকালে ছবিটা একটু অন্য রকম মনে হয়। সেখানে অধিকাংশই গড়ে ৮ ঘণ্টার কম ঘুমোয়। অথচ বিশ্বের দীর্ঘায়ু জনসংখ্যার তালিকায় জাপান বরাবরই উপরের দিকে। তা হলে কি বেশি না ঘুমিয়েই দীর্ঘদিন সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব?
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন-এর একটি তথ্য থেকে জানা যায়, এক এক দেশে ঘুমের সময় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যেমন, এশিয়ার গড় ঘুমের সময় অন্য মহাদেশের তুলনায় কম। জাপানে গড়ে প্রতি রাতে প্রায় ৪৭১ মিনিট, অর্থাৎ ৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ঘুমোন মানুষ। এই হিসাব ৮ ঘণ্টার খুব কাছাকাছি। কিন্তু ৮ ঘণ্টা নয়। সে দেশে গড়ে ঘুমোনোর সময় বেশ কম।
৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ঘুমোন জাপানিরা। ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি
ঘুমের ক্ষেত্রে শুধু কতক্ষণ ঘুমোচ্ছেন, তা নয়, ঘুম কতটা নিরবচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং প্রতিদিন ঘুমোনো ও ওঠার সময় কতটা হেরফের হচ্ছে, সে দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন বদলাতে পারে। তাই অন্য দেশের মানুষের গড় ঘুমের সময় দেখে নিজের ঘুম কমিয়ে ফেলা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
জাপানের দীর্ঘায়ুর কারণ শুধু ঘুমের সময়ের মধ্যে লুকিয়ে নেই। জাপানিদের খাদ্যাভ্যাস, শরীরের ওজন, জীবনযাপন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিও এর সঙ্গে জড়িত। কী ভাবে প্রভাব ফেলে সেগুলি?
১. জাপানিদের দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে তাঁদের খাদ্যাভ্যাসের কথা উঠে আসে বার বার। ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাবারে মাছ, সামুদ্রিক খাবার, সয়াবিনজাত খাবার, শাকসব্জি এবং গ্রিন টি-র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার তুলনামূলক ভাবে কম থাকার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। মাছ থেকে পাওয়া ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। সয়াবিন ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে মেলে প্রোটিন এবং নানা পুষ্টিকর উপাদান। এর ফলে শরীরে প্রদাহ বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।
তাঁরা কোন ধরনের খাবার খান? ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি
২. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলত্ব হৃদ্রোগ-সহ একাধিক দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জাপানের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে স্থূলত্বের হার কম থাকাটাও দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য কারণের একটি হতে পারে। জাপানিরা যাতায়াতের জন্য গণপরিবহণ এবং হাঁটার উপর ভরসা রাখায় ওজন নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয় আরও।
৩. যত্রতত্র অল্প ঘুমিয়ে নেওয়ার অভ্যাস রয়েছে জাপানিদের। আর এটি শরীরের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। বাসে-ট্রেনে বা কাজের ফাঁকেও স্বল্পদৈর্ঘ্যের নিদ্রা স্বাভাবিক বলেই ধরা হয় সেখানে। এর ফলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে।
৪. রাতে ঘুমোনোর আগে ঈষদুষ্ণ জলে গা ধুয়ে নেওয়ার রীতি রয়েছে জাপানে। এই স্নানের ফলে স্নায়ুর উত্তেজনা প্রশমিত হয়। ফলে দ্রুত ঘুম চলে আসে। ঘুমটা হয়ও ভাল।
দীর্ঘায়ুর কোনও একটিমাত্র সূত্র নেই। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরচর্চা, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা— এই অভ্যাসগুলির সম্মিলিত প্রভাবই দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। জাপানের উদাহরণ থেকে তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা, ৮ ঘণ্টার হিসাব মেলানোর চেয়ে নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলাই বেশি জরুরি।
