নদী শুধু এক টুকরো জলধারা নয়; নদী একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর বুকে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানি, দুই তীরের সবুজ প্রকৃতি, মাঝির নৌকা আর জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। নদীর এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সেই নদী যখন ধীরে ধীরে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, আর দূষণের কারণে জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক নদীই দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে। একসময় যে নদীগুলো ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেগুলোর অনেক এখন দূষিত পানি, দুর্গন্ধ আর জমে থাকা বর্জ্যরে পরিচয়ে পরিচিত। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, বাজার, কলকারখানা ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও নদীর স্বাভাবিক সীমানা সংকুচিত হয়েছে, কোথাও আবার নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বর্জ্য ও পলির কারণে। অথচ নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা, সভা-সেমিনার ও নানা কর্মসূচির অভাব নেই। তারপরও নদীর বাস্তব অবস্থা যদি দিন দিন খারাপ হতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু সচেতনতার অভাবে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ঘাটতি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটের একটি সাধারণ চিত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই দেখা যায়। আমরা অধিকাংশই নিজের ঘর, কর্মস্থল কিংবা আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে চাই। কিন্তু পরিষ্কার করার পর যে ময়লা-আবর্জনা তৈরি হয়, সেটি কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে কিংবা শেষ পর্যন্ত পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেসব নিয়ে অনেকেই ভাবি না। কিন্তু বর্জ্য কখনও নিজে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় না। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেললেই তার সমস্যার সমাধান হয় না। রাস্তার পাশে ফেলে রাখা ময়লা বৃষ্টির পানিতে নালায় গিয়ে জমতে পারে, নালা থেকে খাল এবং খাল থেকে নদীতে পৌঁছাতে পারে। এভাবেই আমাদের চোখের আড়ালে বর্জ্য জমতে জমতে একসময় বড় পরিবেশগত সংকট তৈরি করে। নদীদূষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্যরে নির্বিচার ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন। পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাচ, ধাতব ক্যান, ব্যাটারি ও বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা না হলে দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়। এসব বর্জ্যরে কিছু অংশ নদীর তলদেশে জমে, কিছু অংশ পানিতে ভাসে, আবার কিছু অংশ ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়ে জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
নদীর তলদেশে বর্জ্য ও পলি জমা হওয়া, নদীর প্রস্থ কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বাঁধ বা স্থাপনা তৈরি হওয়ার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। তবে নদীর নাব্যতা হ্রাসের জন্য শুধু বর্জ্যকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না; পলি জমা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নদী দখল এবং পর্যাপ্ত নাব্যতা ব্যবস্থাপনার অভাবও এর সঙ্গে জড়িত। এসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে নদীর পানি ধারণ ও প্রবাহিত করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি হলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাস্তা, বাজার ও আবাসিক এলাকার ময়লা নালা-নর্দমায় জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, যান চলাচলে সমস্যা দেখা দেয় এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশে নদী রক্ষার জন্য আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি নদীকে বাঁচানোর জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেব, নাকি নদী হারিয়ে যাওয়ার পর তার গুরুত্ব উপলব্ধি করব? নদী একবার তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারালে তাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। তাই নদীকে বাঁচানোর লড়াই আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। এখনই সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা কাটিয়ে নদী রক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করার।
সিনথিয়া ইসলাম খুশবু : শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
