ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচারে মুন্সিগঞ্জের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতী ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চল আবহমানকাল থেকেই কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে পরিচিত।
অতীশ দীপঙ্কর, বাবা আদম শহীদ, জগদীশচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সত্যেন সেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বুদ্ধদেব বসুর মতো কীর্তিমান ব্যক্তিদের স্মৃতিধন্য জেলা মুন্সিগঞ্জ। প্রাচীন বিক্রমপুর নামে পরিচিত এ জনপদ একসময় শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চায় বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী অঞ্চল ছিল। ইতিহাসের নানা বাঁকে এখান থেকে উঠে এসেছেন বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সুফি সাধক, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তাদের অবদান ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। অথচ যে জনপদ একসময় জ্ঞানচর্চা ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে সেই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও চর্চার উদ্যোগ এখনো সীমিত। কমেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি। ফলে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচারে মুন্সিগঞ্জের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতী ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চল আবহমানকাল থেকেই কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে পরিচিত। সুবিশাল আড়িয়ল বিল ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাল শাসনামলে বিক্রমপুর ছিল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে মোগল শাসনামলে বর্তমান মুন্সিগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকা ইদ্রাকপুর নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, পরবর্তীকালে জমিদার মুন্সি এনায়েত আলীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম হয় মুন্সিগঞ্জ।
এ জনপদের ঐতিহাসিক গুরুত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ৯৮২ সালে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জ্ঞানসাধনা ও বৌদ্ধধর্মের দর্শনচর্চায় অসামান্য অবদান রাখা এ পণ্ডিত পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধশিক্ষা কেন্দ্রে অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার, সংস্কার ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১০৫৪ সালে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। আজও তিব্বতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় তাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান শুধু মুন্সিগঞ্জের নন, তিনি সমগ্র বাংলা তথা এশিয়ার গৌরব। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রাচীন বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামেই তার জন্ম ও শৈশব কাটে। পরবর্তী সময়ে জ্ঞান অর্জন ও বৌদ্ধধর্মের সাধনায় তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার, সংস্কার ও জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রাখেন।’
তবে এ মহান পণ্ডিতের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক বিমান চন্দ্র বড়ুয়া। তার মতে, শুধু স্মৃতিফলক, স্মৃতিসৌধ বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। অতীশ দীপঙ্করের জীবন ও কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক দলিলের অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। পণ্ডিতভিটার যথাযথ সংরক্ষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, প্রাপ্ত নিদর্শনের সুরক্ষা, গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা এবং তার জীবনদর্শন নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐতিহাসিক স্থানটিকে দেশী-বিদেশী গবেষক ও পর্যটকদের কাছে পরিচিত করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মুন্সিগঞ্জের ইতিহাসে আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম বাবা আদম শহীদ। বাংলায় ইসলাম প্রচারে যেসব সুফি সাধক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে তাকে অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১০৯৯ সালে তায়েফে জন্মগ্রহণ করেন বাবা আদম শহীদ। পরে আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্যে তিনি বাগদাদে যান এবং হজরত আবদুল কাদের জিলানীর সাহচর্য লাভ করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ১১৫২ সালে ১২ জন সঙ্গী নিয়ে তিনি মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিমের দরগাবাড়ি এলাকায় আসেন বলে প্রচলিত আছে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি নিহত হন।
মুহাম্মদ এনামুল হকের ‘বঙ্গে সুফী প্রভাব’ গ্রন্থে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সুফি সাধকদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বাবা আদম ও বাবা আদম শহীদের পৃথক উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে শাহ হুমায়ুন কবিরের ‘দ্য ব্যাটল অব কানাই চাংগু’ গ্রন্থেও ১১৫২ সালে মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন রামপাল এলাকায় বাবা আদমের আগমনের কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি মুন্সিগঞ্জের কপালদুয়ার, মানিকেশ্বর ও ধীপুরে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচার করেন। ইতিহাস, লোককথা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্মিলনে বাবা আদম শহীদের স্মৃতি এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
বিজ্ঞান ও রাজনীতিতেও মুন্সিগঞ্জের অবদান উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পৈতৃক নিবাস ছিল শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়ীখাল গ্রামে। উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা নিয়ে তার গবেষণা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ১৮৯৫ সালে অতিক্ষুদ্র তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ সৃষ্টি ও তারবিহীনভাবে সংকেত প্রেরণের পরীক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন তিনি। বিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১৫ সালে তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের জন্মও মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার তেলীরবাগ গ্রামে, ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর। আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতাসংগ্রামী, কবি ও লেখক হিসেবে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বরাজ্য পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম চিত্তরঞ্জন দাস তার উপার্জিত সম্পদ জনকল্যাণে ব্যয় করে দানশীলতার জন্যও স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন, ত্যাগ ও সমাজসেবার ইতিহাস বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রগতিশীল রাজনীতির ক্ষেত্রেও মুন্সিগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সত্যেন সেন ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জিতেন ঘোষের জন্মও এ অঞ্চলে, লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ গ্রামে। তাদের জীবন ও কর্মে রাজনৈতিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।
মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামে অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স ও স্মৃতি জাদুঘর
সাহিত্যাঙ্গনেও মুন্সিগঞ্জের অবদান বিস্তৃত। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক নিবাস ছিল মুন্সিগঞ্জের মালপদিয়া গ্রামে। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র মতো উপন্যাসে মানুষের জীবন সংগ্রাম, সামাজিক বাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তুলে ধরে বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন তিনি। কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর পৈতৃক নিবাস ছিল মালখানগরে। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসুর জন্ম ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের রাজানগরে। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তার সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৮০ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জ একসময় বিক্রমপুর নামে পরিচিত ছিল এবং বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। অতীশ দীপঙ্কর ও বুদ্ধদেব বসুর মতো মনীষীদের জন্মস্থান হিসেবে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। অতীতে নৌপথ ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ছিল। ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বাণিজ্যে মুন্সিগঞ্জের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়েছিল।’
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রভাব কমতে থাকে বলে মনে করেন অধ্যাপক আশফাক হোসেন। তার ভাষ্য, দেশভাগ, সীমানার পরিবর্তন ও মানুষের দেশত্যাগের ফলে শিক্ষিত ও মেধাবী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এ অঞ্চল ছেড়ে যায়। এতে স্থানীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বিশেষ করে জাপানে অভিবাসনের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের অনেক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ধরে রাখতে এবং এলাকার সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সমৃদ্ধ অতীতের বিপরীতে বর্তমান সাংস্কৃতিক চর্চার সীমাবদ্ধতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের তুলনায় মুন্সিগঞ্জে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আশানুরূপ নয়। মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে নতুন প্রজন্মের জানার সুযোগও সীমিত। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ, গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ে ইতিহাসভিত্তিক আয়োজন বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে একসময়ের প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক জনপদের ঐতিহ্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন। তিনি বলেছিলেন, ‘এ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক, আমি তা চাই না।’ বক্তব্যটি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হলে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চান। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংকীর্ণভাবে আলোচনা করতে গিয়ে এমন মন্তব্য করা ঠিক হয়নি বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
উগ্রবাদের বিষয়ে নিজে সোচ্চার রয়েছেন জানিয়ে সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সারা দেশেই সরকার কঠোর অবস্থানে। মুন্সিগঞ্জেও যাতে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ড করার সুযোগ না পায় সে বিষয়ে আমরাও তৎপর।’
মুন্সিগঞ্জকে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রাচীন বিক্রমপুরের গৌরবময় ইতিহাস, অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি, ইদ্রাকপুর কেল্লা, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি আমাদের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে ঘাটতি, সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর দুরবস্থা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিতে সে গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়েছে। এ থেকে উত্তরণে সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যচর্চা, লোকজ ঐতিহ্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার জন্য শিল্পকলা একাডেমির অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান, গণসদন হলের মতো ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পুনরুজ্জীবিত করা এবং শিল্পীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের উদ্যোগ নেয়া হবে।’
এক সময়ের অসাম্প্রদায়িক চর্চায় এগিয়ে থাকা মুন্সিগঞ্জে গত এক দশক ধরে উগ্রবাদের ঘটনা সামনে আসছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এ জেলায় প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি সংগঠনের চার সদস্য ওই বছরের ১১ জুন লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে তার নিজ গ্রাম সিরাজদিখানের কাকালদী এলাকায় গুলি করে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে একই বছর ২৭ জুন এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে পুলিশের চিহ্নিত আসামি আব্দুর রহমান ওরফে লালু, সাঈদ, আক্কাস, কাওসার পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। উগ্রবাদের ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের নাম আবারো সামনে আসে ২০২৩ সালে। নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার আমির আনিসুর রহমানসহ তিনজনকে ওই বছর গ্রেফতার করে র্যাব (বর্তমান নাম এসআরবি)। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার নওপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট) সহায়তা করে থাকে বলে দাবি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
এছাড়া এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ধর্মীয় প্রভাব লক্ষণীয়। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুধাবন’ শীর্ষক এক গবেষণা চালায়। ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তির ক্ষেত্রে মুন্সিগঞ্জের অভিভাবকরা যেসব বিষয় গুরুত্ব দেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এ জেলায় কওমি, আলিয়া ও ক্যাডেট মাদ্রাসা মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়।
খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা ও মুন্সিগঞ্জ জেলার সহসভাপতি নূর হোসাইন নূরানী। তিনি মনে করেন, মুন্সিগঞ্জের লোক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারা অতীতের তুলনায় ম্লান হওয়ার একটি বড় কারণ যোগ্য নেতৃত্বের অভাব।
নূর হোসাইন নূরানী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে হামলা-মামলা ও হিংসার সংস্কৃতি তৈরি হলেও ধর্মীয় কারণে এখানে কোনো অস্থিরতা নেই। এখানে কখনো কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা দেয়ার ঘটনাও ঘটেনি। আর জঙ্গিবাদ নিয়ে অনেকে অভিযোগ তুললেও এ শব্দটির সঙ্গে আমি একমত নই, এটি মূলত পশ্চিমাদের তৈরি। মুন্সিগঞ্জে এ ধরনের কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। বহিরাগত কেউ অনেক সময় পরিচয় লুকিয়ে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয় জনগণ এসব বিষয়ে সচেতন।’
মানুষের ওপর হামলার যেকোনো ঘটনাই সন্ত্রাসী কার্যক্রম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আলেম সমাজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও উগ্রবাদকে পুরোপুরি ঘৃণা করে। এখানে প্রায় ২৪৫টি কওমি মাদরাসা রয়েছে, সেগুলোয় নিয়মিতই সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নজরদারিতে রাখা হয়, যাতে কেউ বিপথগামী হয়ে না পড়ে।’
মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ইতিহাস চর্চা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ আরো জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, এ জনপদের ইদ্রাকপুর দুর্গ, প্রাচীন বিক্রমপুরের বৌদ্ধ ও সেন আমলের স্থাপত্যসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংস্কার ও সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। একই সঙ্গে এসব ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে গবেষণা, তথ্যভিত্তিক প্রকাশনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ইতিহাসচর্চা এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়ানো প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার লুৎফুল এলাহী বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চা ও ঐতিহ্য এ অঞ্চলের ইতিহাস এবং মানুষের আত্মিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ৯৩ শতাংশের বেশি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও তা এ অঞ্চলের মূল অসাম্প্রদায়িক সামাজিক কাঠামোকে নষ্ট করতে পারেনি।’
এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনা বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লোকসংগীত, নাট্যচর্চা, যাত্রাপালা, সাহিত্য, নদীকেন্দ্রিক জীবন ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, অবকাঠামোগত সংকট, অর্থায়নের অভাব এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ঐতিহ্যের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ায় সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গণসদন হলের সংস্কার জরুরি। একসময় এটি জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বলে জানান স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের মুন্সিগঞ্জ জেলার সভাপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন সজল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার ছয় উপজেলায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন, প্রশিক্ষণ, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় শিল্পীদের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বিক্রমপুরের লোকসংগীত, আঞ্চলিক ভাষা, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও গুণী ব্যক্তিদের জীবনকর্ম ডিজিটাল আর্কাইভ, প্রামাণ্যচিত্র ও প্রকাশনার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। আমরা চাই, অতীতের গৌরবকে শুধু স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মুন্সিগঞ্জকে আবারো প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা হোক।’
ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও মুন্সিগঞ্জকে গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রশাসনিক সমন্বয়, গবেষণা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বিক্রমপুরের গৌরবময় অতীত তুলে ধরা সম্ভব হবে। মনীষীদের স্মৃতি কেবল অতীতের গৌরব হিসেবে নয়, বর্তমানের জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের প্রেরণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এখন মুন্সিগঞ্জের বড় চ্যালেঞ্জ।
মুন্সিগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি চাই, বিক্রমপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গবেষণা, সাংস্কৃতিক উৎসব, পাঠাগার ও জাদুঘরভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার হোক। সরকারি সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বাজেট এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এ অঞ্চলকে আবারো জ্ঞান, সংস্কৃতি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে অবহেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য চর্চার ঘাটতির কারণে মুন্সিগঞ্জের গৌরব অনেকটাই আজ ম্লান। এ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সংগীতের চর্চা সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
একই কথা জানান মুন্সিগঞ্জ-১ (শ্রীনগর ও সিরাজদিখান) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্য রক্ষা শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাস, পরিচয় ও গৌরব তুলে ধরার দায়িত্ব। শ্রীনগরের ঐতিহাসিক শ্যামসিদ্ধির মঠ, সিরাজদিখানের প্রাচীন স্থাপনা, বিক্রমপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এজন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগারের উন্নয়ন, নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিহাস-ঐতিহ্যভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য বিক্রমপুরের গৌরব পুনরুদ্ধার, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মুন্সিগঞ্জকে ইতিহাস ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি শুভ ঘোষ
