ফুটবল মাঠে তার জাদুতে মেতেছিল পুরো বিশ্ব। কিন্তু মাঠের বাইরের জীবনের শেষ অধ্যায় ঘিরে পাঁচ বছর পরও কাটেনি রহস্য! আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় এবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন তার চিকিৎসক লিওপোলদো লুকে। তার আইনজীবীদের দাবি, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতেই অন্যায়ভাবে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে চিকিৎসককে।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর, ৬০ বছর বয়সে মারা যান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা। হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতার পাশাপাশি ফুসফুসে পানি জমেছিল তাঁর। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহ পর তিগ্রের বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ম্যারাডোনা।
সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, নাকি চিকিৎসায় অবহেলার কারণে ঘটেছিল-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছে বিচার। লুকে ছাড়াও আরও ছয় স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। বুধবার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে লুকের আইনজীবী রবার্তো রালিন দাবি করেন, তার মক্কেল নির্দোষ। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে তাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
লুকের আরেক আইনজীবী ফ্রান্সিসকো ওনেতো আরও এক ধাপ এগিয়ে ম্যারাডোনার মৃত্যুকে আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার যুক্তি, এমন পরিণতি আগে থেকে অনুমান করার সুযোগ ছিল না। চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে নয়, বরং অনিশ্চিত শারীরিক জটিলতাতেই মৃত্যু হয়েছিল কিংবদন্তির।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের চোখে ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার অবনতির একাধিক সতর্কসংকেত পাওয়া গিয়েছিল। এরপরও তাঁর চিকিৎসায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে লুকের জন্য ১২ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে তাকে।
মামলায় এর আগে ২০২১ সালে আদালতের গঠন করা বিশেষজ্ঞ কমিশনের প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, ম্যারাডোনার আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ছিল, যা চিকিৎসার সময় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই বক্তব্য মানতে নারাজ আসামিপক্ষ। তাদের দাবি, অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষায় হৃদ্যন্ত্রের কোনো সমস্যা শনাক্ত হয়নি।
বিচারপ্রক্রিয়ায় শুধু লুকে নন, চিকিৎসাসেবার সমন্বয়ক ন্যান্সি ফোরলিনিও এখন প্রশ্নের মুখে। তাঁর আইনজীবী অবশ্য দায়ের ভার অন্যদের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ম্যারাডোনার স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব পালনে লুকে ও আরেক চিকিৎসকের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। অন্যদিকে, বাড়িতে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত না করার অভিযোগে ফোরলিনির বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই বিচারপ্রক্রিয়ায় সাত স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শুনানি চলছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের জন্য চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড চেয়েছেন প্রসিকিউটররা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক চলার কথা রয়েছে!
ম্যারাডোনার মৃত্যু তাই এখনো শুধু একটি কিংবদন্তির বিদায়ের গল্প নয়, বরং চিকিৎসাব্যবস্থার দায়িত্ব ও অবহেলার সীমারেখা নির্ধারণের লড়াই। আদালতে দুই পক্ষের যুক্তি সম্পূর্ণ বিপরীত। একপক্ষের চোখে এটি অনিবার্য মৃত্যু, অন্যপক্ষের মতে অবহেলার পরিণতি। শেষ পর্যন্ত কোন বক্তব্যের পক্ষে রায় যায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা!
