দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু দুর্নীতির মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে সেই দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার জট ও নিষ্পত্তির ধীরগতি এমনই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে ফলপ্রসূ করতে হলে তদন্তের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ায়ও গতি আনতে হবে।
দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের আগস্ট শেষে দুদক ও বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মোট ৩ হাজার ৩৪৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪৭৩টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে দুদকের আরও ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা বিচারাধীন। এত বিপুলসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে। দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি না হলে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিরাও দীর্ঘদিন আইনি অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অবশ্য মামলার নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানে কিছু অগ্রগতিও রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দুদক ও বিলুপ্ত ব্যুরোর মোট ২৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের ২৬৭টি মামলার চেয়ে বেশি। তবে বিচারাধীন মামলার বিপুল সংখ্যার তুলনায় এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। নতুন মামলা দায়ের অব্যাহত থাকলে নিষ্পত্তির গতি আরও বাড়ানো ছাড়া মামলার জট কমানো সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দ্রুত নিষ্পত্তির অর্থ কেবল মামলার সংখ্যা কমানো নয়; বরং নিরপেক্ষ বিচার, যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং ন্যায়সংগত রায় নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মামলাজট কমাতে বিশেষায়িত আদালত গঠনের প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে যেসব আদালতে দুদকের মামলার বিচার হয়, সেখানে অন্যান্য মামলাও পরিচালিত হয়। ফলে সময় ও বিচারিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় দুর্নীতির মামলাগুলো প্রত্যাশিত অগ্রাধিকার পায় না। বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত বিচারক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ বিশেষায়িত আদালত গঠন করা গেলে মামলার শুনানি নিয়মিত করা এবং দীর্ঘদিনের জট কমানো সহজ হতে পারে। তবে শুধু আদালত গঠন করলেই হবে না; আদালতের সংখ্যা, মামলার চাপ ও জনবলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। দুদকের নিজস্ব দক্ষ ও স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলাও জরুরি। দক্ষ আইনজীবীর অভাব, সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপনে দুর্বলতা এবং তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনা বা সাময়িক ব্যবস্থার পরিবর্তে যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি দুদকের জনবল সংকট দূর করে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল ও বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তির জন্যও বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। স্থগিত মামলাগুলোর কারণ পর্যালোচনা, পুরনো মামলাগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ, নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্রুত বিচারের নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন কিংবা প্রভাবশালী অভিযুক্তরা বিশেষ সুবিধা না পান।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং যথাসময়ে বিচার সম্পন্ন হবে। মামলার জট কেবল আদালতের সমস্যা নয়; এটি দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই বিশেষায়িত আদালত, দক্ষ স্থায়ী প্রসিকিউশন, পর্যাপ্ত জনবল এবং উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আর বিলম্ব কাম্য নয়। দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করতে হলে দীর্ঘসূত্রতার সংস্কৃতি ভাঙতেই হবে।
