মা–বাবা চাইতেন না ছেলে গানবাজনা করুক, গায়ক হোক। বাবা বলতেন, বাড়িতে বাউলদের কোনো জায়গা নেই। একসময় অভিমান করে বড় স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন আইয়ুব বাচ্চু। তখন পকেটে ছিল মাত্র ৬০০ টাকা। ওঠেন এলিফ্যান্ট রোডের একটি হোটেলে। হোটেল লবিতে পাটি বিছিয়ে মেঝেতে থাকতেন। স্বপ্নবান এই তরুণ একসময় অনুশীলন, সাধনা ও একাগ্রতায় দেশবরেণ্য গিটার জাদুকর ও গায়ক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।
আইয়ুব বাচ্চু তাঁর মাকে খুব ভালোবাসতেন। ২০০৪ সালের দিকে ওনার মা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। বিদেশেও চিকিৎসা করিয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘দেশকে ভালোবাসতে হবে সবার আগে। কেননা মা কষ্ট পেলে দেশ কষ্ট পাবে।’
বাচ্চু ভাইয়ের একটা সাক্ষাৎকার দেখে আপ্লুত হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘মা–বাবা ছাড়া তো আমি কিছুই না। ওনাদের অবদানেই আমার জীবন। এটা আল্লাহর নেয়ামত। যারা মা–বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, একটা মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জাকর আর কিছু হতে পারে না। যে মায়ের গর্ভে ১০ মাস ১০ দিন থেকে জন্মেছি আমি, সেই মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছি, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য সন্তানের জন্য কী হতে পারে! টাকাপয়সা থাকলে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে অন্তত একটা ঘর ভাড়া করে মাকে আলাদা রাখুন। বৃদ্ধাশ্রম মা–বাবার জীবন হতে পারে না।’

গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চুর শিকড়ের প্রতি প্রচণ্ড টান ছিল। একবার পটিয়া স্কুলমাঠে কনসার্টে এসে বলেছিলেন, ‘আঁর বাড়ি পইট্যা, তোয়ারা আঁরে গাইবের লাই নহ ডাহ দওত ন দ (আমার বাড়ি পটিয়া, তোমরা আমাকে গাওয়ার জন্য দাওয়াত করো না।’ তখন একজন বললেন, ‘ভাই, আপনার সম্মানী বেশি, সে জন্য সাহস করি না।’ জবাবে বলেছিলেন, ‘আগে দওত দিতা, সম্মানী ন লইতাম এরি (আগে দাওয়াত করে দেখতে, সম্মানী না নিতাম)।’ হা হা বলে হাসতে থাকেন।
১৯৯৮ সালের কথা। আমেরিকার নিউইয়র্কে কনসার্ট করতে গিয়েছিলেন। কনসার্ট শেষে এলআরবি ব্যান্ডের সদস্যদের নিয়ে একটা শপিং মলে ঢোকেন। বড় একটা গিটারের দোকানে গিয়ে গিটারগুলো দেখেন। আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের প্রতি দারুণ আসক্তি। নতুন ব্র্যান্ডের গিটার দেখলে হাতে নিয়ে দেখতে চাইতেন। হঠাৎ বিশ্বখ্যাত জাপানি ব্র্যান্ড আইভানেজ গিটারের ওপর চোখ পড়ে এবং সেটি তাঁর পছন্দ হয়। গিটারটি দেখতে চাইলে দোকানদার জিজ্ঞেস করেন, কোন দেশ থেকে এসেছেন। জবাবে বাংলাদেশ বললে দোকানি খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলেন, ‘এই গিটার বাংলাদেশির জন্য নয়। এই দেশে এটা সবচেয়ে দামি গিটার; তুমি কিনতে পারবে না, অন্যটা দেখো।’

এ কথা শুনে বাচ্চু খুব আহত হন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান দেশকে অপমান করাতে। তাঁর মধ্যে জেদ চেপে বসে। দোকানদারকে বলল, ‘আমার দলের সবার কাছে যে ডলার আছে, আশা করি গিটারটি নিতে পারব।’ দোকানদারের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও গিটারটি দেখতে দেন। গিটারটি হাতে নিয়ে বাচ্চু বাজাতে শুরু করেন। এমন দরদ দিয়ে বাজালেন, পুরো মার্কেটে লোকজন জড়ো হয়ে যায়।
এবার দোকানদার বাচ্চু বললেন, ‘তুমি অসাধারণ বাজাও, এই গিটার তোমার জন্যই। তোমাকে হাফ দামে দেব।’ এবার আইয়ুব বাচ্চু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘এটা তুমি আমাকে বিনে পয়সায় দিলেও আমি নেব না। তুমি আমার দেশকে অপমান করেছ। যে গিটারের জন্য আমার দেশ অপমানিত হয়, সেই গিটার আইয়ুব বাচ্চু বিনা পয়সায় নেবে না এবং দ্বিতীয়বার বাজাবেও না।’
আইয়ুব বাচ্চু সুফিভক্ত ছিলেন। তিনি মাইজভান্ডার দরবার শরিফের ভক্ত। আধ্যাত্মিক সুফি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমানের বাসায় তাঁকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন বাচ্চু। তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী হলেও সুফিদের খুব সম্মান করতেন এবং সুফিবাদ চর্চা করতেন।
নিজের মৃত্যুর এক মাস আগে এলআরবি ব্যান্ড দলের এক সদস্যের বাবা মারা গেলে তাঁকে চিরবিদায় দিতে গিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘চাচা, আপনি যাচ্ছেন, আমরা আসতেছি।’
ঠিক এক মাস পর বাচ্চু ভাই না–ফেরার দেশে চলে যান। মৃত্যুর পূর্বে মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে। চৈতন্যগলী কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ককে টাকা দিয়ে বলেছিলেন, মায়ের কবরটা যেন সব সময় পরিষ্কার রাখেন। ফুলের চারা লাগানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, যদি তাঁর কিছু হয়ে যায়, মায়ের পাশে যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়।
গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে এবি লাউঞ্জ করতে চেয়েছিলেন নব্য ব্যান্ড শিল্পীদের জন্য। যেখানে নতুন গায়কেরা গিটার বাজাবে, গাইবে। তাঁর পটিয়া গ্রামের বাড়িতে একটি হাসপাতাল করারও স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নগুলো পূরণ করা হয়নি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর লক্ষ কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না–ফেরার দেশে চলে যান তিনি।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, চৈতন্যগলি কবরস্থানে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর কবরটি অরক্ষিত এবং অবহেলিত। নেই কোনো এপিটাফ। তাঁর ভক্তরা কবর জিয়ারত করতে এসে কবর খুঁজে পান না। আইয়ুব বাচ্চু ভক্তদের প্রাণের দাবি, ‘এবি লাউঞ্জ’ নামে চট্টগ্রামে গিটার একাডেমি স্থাপন করা হোক। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র মহোদয়ের প্রতি বিষয়টি সুদৃষ্টি কামনা করছি।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা
