ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারায় নন্দিনী। এরপর অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে মেয়েকে বড় করেন মা লিপি রানি। কিন্তু বড় হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্নও বারবার ভেঙেছে দারিদ্র্যের কাছে। পাঁচ-ছয়বার বিয়ে ঠিক হয়েও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। সপ্তমবার বিয়ে ঠিক হলেও অর্থাভাবে দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে পারছিলেন না মা। সেই নন্দিনীর বিয়েতেই এবার জ্বলেছে রঙিন আলোর ঝলকানি, তৈরি হয়েছে বিশাল প্যান্ডেল, সাজানো হয়েছে বিয়ের মঞ্চ ও ছায়ামণ্ডপ। বরযাত্রীদের জন্য ছিল খাবারের আয়োজন। প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকার সহযোগিতায় ধুমধাম করে সম্পন্ন হয়েছে নন্দিনীর বিয়ে।
সম্প্রতি নন্দিনীকে নিয়ে কালবেলা মাল্টিমিডিয়ায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নজর কাড়ে সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাসের। এরপর নন্দিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন তিনি। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সংগৃহীত অর্থে বিয়ের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা, গয়না ও অনুষ্ঠানের যাবতীয় আয়োজন করা হয়।
বিয়েতে শুধু আনুষ্ঠানিকতার ব্যবস্থাই নয়, নন্দিনীর মায়ের হাতে বিয়ে-পরবর্তী খরচের জন্য নগদ ৬০ হাজার টাকাও তুলে দেওয়া হয়।
মেয়ের বিয়ে নিয়ে আবেগাপ্লুত মা লিপি রানি বলেন, আমার মেয়ের ছয়বার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরে কালবেলা থেকে একটা নিউজ করা হয়। তারপর মামুন বিশ্বাস ভাই আমার পাশে দাঁড়ান। তার জন্য আজকে আমি খুব খুশি। আমার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, আমার মতো খুশি আর পৃথিবীতে কেউ নাই। আমার মেয়ের বাবা নাই দেখে আমার পাশে সবাই দাঁড়াইছে। আমিও খুশি এবং আমার মেয়েও খুশি।
বিয়ের আয়োজনের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ের বিয়েতে আজকে বড় ধরনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। লেপ-ক্ষ্যাতা, বালিশ সবই দিছে, সোনাদানাও দিছে। অসংখ্য ধন্যবাদ আমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
বিয়ের সাজে নন্দিনীর চোখেমুখেও ছিল আনন্দের ছাপ। বাবাকে হারানোর পর মায়ের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ছয় বছর বয়সে আমার বাবা মারা যায়। তারপর আমার মা আমাকে দুঃখ-কষ্ট করে বড় করেছে। আমার ছয়বার বিয়ে ভেঙে যায়।
নন্দিনী বলেন, কালবেলার একটা নিউজ দেখে মামুন মামা আমার পাশে দাঁড়ান। মামুন মামা আমার বিয়ে অনেক ধুমধাম করে দিচ্ছেন। বিয়েতে গয়না দিয়েছেন, পার্লার থেকে আমাকে সাজিয়ে দিয়েছেন। এগুলো আমার চিন্তায় ছিল না। মামুন মামা আমার পাশে এসে দাঁড়ানোর পর জীবনটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। এখন আমার অনেক ভালো লাগছে।
বিয়ের দিন নন্দিনীকে পাশে নিয়ে সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, নন্দিনীর জন্মের পরই তার বাবা মারা যান। নন্দিনী নামটা সুন্দর হলেও জীবনটা কষ্টকর। ছয়বার বিয়ে ঠিক হয়, কিন্তু অভাবের কারণে সে বিয়ে ভেঙে যায়।
তিনি বলেন, কালবেলা তাকে নিয়ে একটা নিউজ করে। এটা দেখার পর আমরা নন্দিনীকে নিয়ে একটা পোস্ট করলে ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকার ব্যবস্থা হয়। সেই টাকা দিয়ে নন্দিনী ও তার মাকে নিয়ে সব জিনিস কেনাকাটা করি।
বিয়ের আয়োজন সম্পর্কে মামুন বিশ্বাস বলেন, বর, মঞ্চ, ছায়ামণ্ডপ, পার্লারে সাজানো, সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি আর দশটা ধনী মেয়ের মতো নন্দিনীকে বিয়ে দিতে। পাশাপাশি নগদ ৬০ হাজার টাকা তার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছি, যাতে বিয়ে-পরবর্তী অনুষ্ঠানে খরচ করতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ১৫৬টি অসহায় মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেছি। নন্দিনীর বিয়ে দিয়ে ১৫৭টি পূর্ণ হলো। এই অবদান কিন্তু আপনাদের সবার। আমরা চাই, নন্দিনীর মতো সারাদেশে যারা আছেন, তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে।
গত ৪ অক্টোবর ‘মেয়ের বিয়ের আগে কোনো বাবা যেন না মরে’ শিরোনামে কালবেলা মাল্টিমিডিয়ায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই প্রতিবেদন দেখেই নন্দিনীর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন মামুন বিশ্বাস। পরে তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি সহযোগিতা করলে ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ হয়। সংগৃহীত সেই অর্থেই অভাবের কারণে বারবার ভেঙে যাওয়া নন্দিনীর বিয়ে এবার সম্পন্ন হলো আনন্দ-উৎসব আর রাজকীয় আয়োজনে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে মায়ের চোখে ফিরেছে স্বস্তি, আর নন্দিনীর জীবনে শুরু হলো নতুন অধ্যায়।
