ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকটের অভিঘাত আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সৌদির আকাশসীমায় ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চরম শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের মোট ৮২টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী শ্রমিক।
বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটের মধ্যে ৩২টি সরাসরি এবং ৫০টি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ট্রানজিট ফ্লাইট।
সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন ট্রানজিট রুটের আওতাধীন ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২টি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৬টি,
ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, সালাম এয়ারের ৪টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের ১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সমস্ত ফ্লাইট স্থগিত করেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের তাদের সমস্ত ফ্লাইট সাময়িকভাবে বাতিল ঘোষণা করেছে।
যাত্রী সহায়তায় বেবিচকের ৭ দফা জরুরি নির্দেশনা : সৌদিগামী যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘব এবং মানবিক বিপর্যয় এড়াতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ সোমবার রাতে সংশ্লিষ্ট সব দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সকে সাত দফা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, সৌদি আরবের বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় যেকোনো বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং অবিলম্বে এই নির্দেশনাগুলো কার্যকর করতে হবে।
১. তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ : ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য যাত্রীদের মুঠোফোনে এসএমএস, সরাসরি ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অবিলম্বে জানাতে হবে। ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত না করে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে স্পষ্টভাবে বারণ করতে হবে।
২. রি-বুকিং ও রিফান্ড সুবিধা : ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, পুনরায় টিকিট বুকিং এবং টিকিটের অর্থ ফেরত (রিফান্ড) সংক্রান্ত সকল প্রযোজ্য নিয়ম যাত্রীদের কাছে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
৩. ভিসা জটিলতায় সহযোগিতা : সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় যেসব প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও অভিবাসন সহায়তা দিতে হবে।
৪. টার্মিনালে খাদ্য ও আবাসন সেবা : পরিস্থিতির খবর না পেয়ে ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানো বা আটকে থাকা যাত্রীদের যথাযথ বসার স্থান, বিশুদ্ধ খাবার পানি, নাশতা ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা এয়ারলাইন্সকেই করতে হবে।
৫. ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের অগ্রাধিকার : বয়োবৃদ্ধ, নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজরদারি ও সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সার্বক্ষণিক ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ : ফ্লাইট বিপর্যয়ের সমন্বয়ে প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে অবিলম্বে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে। তার নাম, পদবি, নম্বর ও ই-মেইল বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে জানাতে হবে এবং তাকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে হবে।
৭. সহানুভূতিশীল আচরণ : কোনো যাত্রীকে কোনো অবস্থাতেই অসহায় বা অভিভাবকহীন অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানবিক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশের দূরদূরান্ত থেকে ঋণ করে ও শেষ সম্বল বিক্রি করে সৌদি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে আসা যাত্রীরা টার্মিনাল এলাকায় ট্রলিতে বসে অনিশ্চিত সময় পার করছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর শঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে অনেককে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের ধৈর্য ধরার এবং নিজ নিজ এয়ারলাইন্স বা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
