দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
এ লক্ষ্যে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম-১৭-এর ফাঁকে গতকাল রোববার দেশ দুটির জ্বালানিসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী নাসের আল-কাহতানি, কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবি এবং এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সামের জে. সেরহানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ
সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় তিনি দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদার করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং ২০৩০ সালের জ্বালানিসংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে সৌদি আরবের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। এজন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং একটি সমঝোতা কাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে সৌদি আরবের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয় সৌদি সরকার। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদারের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সৌদি প্রতিনিধি।
বৈঠকের শুরুতে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোক প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী। তিনি এ ধরনের হামলার নিন্দা জানান এবং সৌদি আরবের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সংহতি প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো শোকবার্তার বিষয়টিও সৌদি প্রতিনিধিকে অবহিত করেন প্রতিমন্ত্রী।
কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিয়ে আলোচনা
কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা এবং বিদ্যমান এলএনজি আমদানি ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ এবং গ্যাসের উৎস ও সরবরাহপথের বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য ওঠানামা এবং সরবরাহসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈঠকে দুই পক্ষই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের তথ্য বৈঠকসংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়নি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে আগ্রহ এসিডব্লিউএ পাওয়ারের
সৌদি আরবভিত্তিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সামের জে. সেরহানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে এসিডব্লিউএ পাওয়ার। এ খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসিডব্লিউএ পাওয়ারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্পের ধরন, স্থান কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বৈঠকসংক্রান্ত বিবরণে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও কাতারের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আলোচনাকে কার্যকর চুক্তি ও বিনিয়োগে রূপ দেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহের নিশ্চয়তা, টার্মিনাল স্থাপনের অর্থায়ন এবং গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের শর্ত নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ এলে প্রকল্পের ব্যয়, বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য, অর্থায়নের শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন এসব আলোচনার ভিত্তিতে কতটা কার্যকর চুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তার ওপরই উদ্যোগগুলোর বাস্তব সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।
