একটি রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন হওয়া আর রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্র বদলে যাওয়া এক কথা নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার চেয়ার বদলাতে পারে, মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আসতে পারে, রাজনৈতিক স্লোগানেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক আনুগত্য এবং অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতার পুরোনো কাঠামো অক্ষত থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সুফল পৌঁছায় না। তখন রাষ্ট্রের বাহ্যিক রঙ বদলায়, অথচ ভেতরের দেয়ালে পুরোনো দাগ থেকেই যায়।
বিরোধী দলে থেকে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা এক বিষয় আর ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে নিজের দলের লোকজনসহ সবাইকে একই আইনের আওতায় আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি রাজনৈতিক বক্তব্য; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার পরীক্ষা।
বিজ্ঞাপন
জনগণ কোনো সরকারকে শুধু তার অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য অনির্দিষ্টকাল ছাড় দেয় না। বরং যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি দল ক্ষমতায় আসে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। কারণ, জনগণের কাছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্যায়ন হয় বক্তৃতার মঞ্চে নয়, দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায়।
একজন যাত্রী বিমানবন্দরে নামবেন, নিজের লাগেজ সংগ্রহ করবেন, স্বজনদের জন্য আনা উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরবেন—এ তো নাগরিক জীবনের একেবারে সাধারণ প্রত্যাশা। অথচ দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলির সংকট, যাত্রী হয়রানি এবং মালামাল চুরির অভিযোগ বারবার সামনে এলে প্রশ্নটি আর নিছক যাত্রীসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে।
বিগত মাফিয়া সরকারের আমলের মাফিয়া সিন্ডিকেটের বিমানবন্দর শাখার দৌরাত্ম্য কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া যাত্রীদের লাগেজ কাটার ভিডিওর বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা কী? অতীতের দুর্নীতি ও এসব প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে?
বিমানবন্দরে অনিয়মের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদকারীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে যে তৎপরতা দেখা গেল, নাগরিকসেবায় ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও কি একই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে? রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিবাদের পেছনে থাকা সমস্যাটির বাস্তবতা কতটুকু। প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নের উত্তর যদি প্রশাসনিক ব্যাখ্যার বদলে শুধু পাল্টা আইনি পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
যে দল দীর্ঘকাল রাজনৈতিক অধিকার, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং বিরোধী মতের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছে, সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থেকে তার কাছে জনগণের প্রত্যাশাও বেশি।
সরকার যদি অতীতের রাজনৈতিক হয়রানির সংস্কৃতি থেকে সত্যিকার অর্থে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতার পালাবদল শুধু শাসকের পরিচয় বদলায়নি, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিয়ে আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পর পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু এখানেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ? সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দিলেই কি কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন নিষ্পত্তি হয়ে যায়? পদত্যাগ কি ফৌজদারি তদন্তের বিকল্প, নাকি এটি তদন্তের পাশাপাশি চলার মতো পৃথক কোনো রাজনৈতিক পরিণতি? পদত্যাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক পদটির অবসান ঘটতে পারে; কিন্তু ঘটনার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল, কে নির্দেশ দিয়েছেন, কে অংশ নিয়েছেন, কারা সুবিধা পেয়েছেন এবং কার কী আইনি দায়—এসব প্রশ্নের উত্তর পদত্যাগপত্রের সঙ্গে জমা পড়ে না। জনগণ শুধু পদত্যাগের খবর শুনতে চায় না; জানতে চায়, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত কোথায় পৌঁছেছে। জনগণ শুধু দলীয় শাস্তির ঘোষণাই নয়, পাশাপাশি দেখতে চায়, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে কি না।
বাংলাদেশে পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট শাসনামলের দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, স্বজনপ্রীতি এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও অনিয়মের সুযোগগুলো কতটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে?
দুর্নীতির কাঠামো রাতারাতি তৈরি হয় না। অর্থনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্বল জবাবদিহির সমন্বয়ে তা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি এসব নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে পুরোনো সুবিধাভোগীরা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
তবে প্রমাণ ছাড়া বর্তমান সরকারকে পুরোনো দুর্নীতির চক্রের পৃষ্ঠপোষক বলে ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। বরং প্রয়োজন—কোন খাতে কী অনিয়ম ঘটেছে, কারা সুবিধা পেয়েছে, তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তথ্যের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা। সরকার পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ এখানেই। পুরোনো সিন্ডিকেটের সাইনবোর্ড বদলে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলে সংস্কার হয় না। ক্ষমতার করিডরে নতুন মুখ এলেও পুরোনো নিয়মেই যদি অনিয়মের সুযোগ বহাল থাকে, তবে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি একসময় ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাও তাই শুধু একটি স্থাপনা ভাঙচুরের মামলা নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, জনসম্পদ ও জনস্বার্থের প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের দায়বদ্ধতা যাচাইয়ের একটি উপলক্ষ। একইভাবে, বিমানবন্দরের ঘটনাও শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বিমানবন্দর কর্মকর্তার বিরোধ নয়; এটি নাগরিকসেবা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির এক বিরাট পরীক্ষা।
কিন্তু একটি বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায়—রাষ্ট্র কি ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে এমন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে, যাতে নাগরিকদের মনে দলীয় পরিচয়ভিত্তিক বিচার পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি না হয়?
যদি পুরোনো প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ভাঙার ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর করতে হয়, তবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধা বণ্টনের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
রাষ্ট্রের পরিবর্তন সেদিনই দৃশ্যমান হবে, যেদিন নাগরিককে আর প্রশ্ন করতে হবে না—কে ক্ষমতাসীন, কে বিরোধী, কে প্রভাবশালী। বরং সবাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে : অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, তদন্ত হবে নিরপেক্ষ; অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা হবে আইনানুগ; আর জনস্বার্থের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকবে না।
ক্ষমতার পালাবদল তখনই অর্থবহ হবে, যখন ক্ষমতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও বদলাবে। অন্যথায় চেয়ার বদলাবে, সাইনবোর্ড বদলাবে, স্লোগান বদলাবে—কিন্তু নাগরিকের ভাগ্যে সেই পুরোনো অপেক্ষাই থেকে যাবে : ন্যায়বিচারের অপেক্ষা, প্রতিকারের অপেক্ষা আর রাষ্ট্র সত্যিই বদলেছে কি না—তার উত্তরের অপেক্ষা।
লেখক : গবেষক
